কিশমিশ খাওয়ার উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ - Benefits and nutritional value of eating raisins
Raisins Grape

কিশমিশ খাওয়ার উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ

কিসমিসের সাথে সকলেই আমরা পরিচিত। কিসমিস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। কিসমিস হল আঙুর ফলের শুকনা রূপ। তাই কিসমিসকে শুকনো ফলের রাজাও বলা হয়। সোনালী-বাদামী রংয়ের চুপসানো ভাঁজ হওয়া ফলটি খুবই শক্তিদায়ক।  এটি তৈরি করা হয় সূর্যের তাপ অথবা মাইক্রোওয়েভ ওভেনের সাহায্যে। তাপের ফ্রুক্টোজগুলো জমাট বেঁধে পরিণত হয় কিশমিশে। আর এভাবেই আঙ্গুর শুকিয়ে তৈরি করা হয় মিষ্টি স্বাদের কিসমিস। যেকোন মিষ্টি খাবারের স্বাদ এবং সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য কিসমিস ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও পোলাও, কোরমা এবং অন্যান্য অনেক খাবারে কিসমিস ব্যবহার কর হয়।

কিসমিস কত প্রকার?

কিসমিসের অনেক প্রকার রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান তিনটি 

বাদামী কিসমিস – এই কিসমিস তিন সপ্তাহ ধরে আঙ্গুর শুকিয়ে তৈরি করা হয়। শুকানোর পরে এগুলি বাদামী হয়ে যেতে পারে। এটি তৈরি করতে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের আঙ্গুর ব্যবহার করা হয়। তাদের রঙ, আকার এবং স্বাদ আঙ্গুর ধরনের উপর নির্ভর করে।

সুলতানা (গোল্ডেন রেজিন) – সুলতানা আঙ্গুর (বীজহীন সবুজ গোলাকার আঙ্গুর) শুকিয়ে এই কিশমিশ তৈরি করা হয়। এই ধরনের কিশমিশ তৈরি করতে আঙুর শুকানোর আগে এক ধরনের তৈলাক্ত দ্রবণে ভিজিয়ে রাখা হয়। এই কারণে, এই কিশমিশের রঙ সোনালি/হালকা বাদামী। এই কিশমিশটি প্রায়শই আকারে ছোট এবং অন্য দুটি কিশমিশের তুলনায় স্বাদে মিষ্টি হয়।

বেদানা (কালো কিসমিস) – এই ধরণের কিসমিসকে বেদানাও বলা হয় এবং এটি কালো আঙ্গুর থেকে তৈরি করা হয়। এগুলোও তিন সপ্তাহ ধরে আঙ্গুর শুকিয়ে তৈরি করা হয়। এদের স্বাদ প্রায়ই টক-মিষ্টি এবং আকারে ছোট। অন্যান্য আঙ্গুরের মতো কালো কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা কি, তাও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে।

কিসমিসের পুষ্টিগুণ

প্রতি ১০০ গ্রাম কিসমিসে রয়েছে এনার্জি ৩০৪ কিলোক্যালরি, কার্বোহাইড্রেট ৭৪.৬ গ্রাম, ডায়েটরি ফাইবার ১.১ গ্রাম, ফ্যাট ০.৩ গ্রাম, প্রোটিন ১.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮৭ মিলিগ্রাম, আয়রন ৭.৭ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ৭৮ মিলিগ্রাম ও সোডিয়াম ২০.৪ মিলিগ্রাম।

কিশমিশ খাওয়ার উপকারিতা 

১.হজমে সহায়তা করে

দেড় কাপ কিশমিশে আছে ৩.৩ গ্রাম ফাইবার বা আঁশ। বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী শরীরের এটি সারা দিনের ফাইবারের চাহিদার ১০ থেকে ২৪ শতাংশ পূরণ করে। আমরা মোটামুটি সবাই জানি, ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ভালো কাজ করে।

২.চোখের জন্য

কিশমিশের পলিফেনিল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। এ ছাড়া এতে আছে ভিটামিন এ, বিটাক্যারটিন ও ক্যারোটিনয়েড। এরা যে চোখের বিশেষ বন্ধু, তা কে না জানে!

৩.দেহে শক্তি সরবরাহ করতে

দুর্বলতা দূরীকরণে কিশমিশের জুড়ি নেয়। দেহে শক্তি সরবরাহ করতে কিশমিশের অবদান অনেক বেশি। কিশমিশে রয়েছে চিনি, গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজ, যা তাৎক্ষণিকভাবে দেহে এনার্জি সরবরাহ করে থাকে। তাই দুর্বলতার ক্ষেত্রে কিশমিশ খুবই উপকারী।

৪.দাঁত এবং মাড়ির সুরক্ষাতে

বাচ্চারা ক্যান্ডি ও চকলেট খেয়ে দাঁত ও মাড়ির ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু এগুলির পরিবর্তে বাচ্চাদের কিশমিশ খাওয়ার অভ্যাস করালে দাঁতের সুরক্ষা হবে। আবার একই স্বাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিপুল পরিমাণ উপকারও পাবে। চিনি থাকার পাশাপাশি কিশমিশে রয়েছে ওলিনোলিক অ্যাসিড, যা মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে বাঁধা দেয়।

৫.হাড়ের সুরক্ষাতে

কিশমিশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, যা হাড় মজবুত করতে বেশ ভূমিকা পালন করে। কিশমিশে আরো রয়েছে বোরন নামক মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস, যা হাড়ের ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। প্রতিদিন কিশমিশ খাওয়ার অভ্যাস হাড়ের ক্ষয় এবং বাতের ব্যথা থেকে দূরে রাখবে।

৬.ক্যানসার প্রতিরোধে

কিশমিশের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহের কোষগুলোকে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল ড্যামেজের হাত থেকে রক্ষা করে এবং ক্যানসারের কোষ উৎপন্ন হওয়ায় বাধা প্রদান করে। কিসমিসে আরো রয়েছে ক্যাটেচিন, যা পলিফেনলিক অ্যাসিড। এটি ক্যান্সার মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

৭.রক্তশূন্যতা দূর করতে

রক্তশূন্যতার কারণে অবসাদ, শারীরিক দুর্বলতা, বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এমনকি, বিষণ্ণতাও দেখা দিতে পারে। কিশমিশে আছে, প্রচুর পরিমাণে লৌহ উপাদান, যা রক্তশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে।

৮.জ্বর নিরাময় করতে

কিশমিশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়ারোধী, এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান ফলে এটা ভাইরাল এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জ্বর নিরাময় করতে সাহায্য কারে।

৯.রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে

কিশমিশ শুধুমাত্র রক্তের মধ্যে থাকা বিষো উপাদান কমায় তাই না, বরং রক্তচাপও কমায়। কিশমিশের প্রধান উপাদান, পটাশিয়াম, রক্তের চাপ কমাতে সাহায্য করে। শরীরে থাকা উচ্চমাত্রার সোডিয়াম, রক্তচাপ বাড়ার প্রধান কারণ। কিশমিশ শরীরের সোডিয়াম মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।

১০.অনিদ্রা

অনেকের ঠিকমত ঘুম আসে না। তাদের জন্য কিশমিশ অনেক উপকারি। কারন কিশমিসের মধ্যে রয়েছে প্রচুর আয়রন যা মানুষের অনিদ্রার চিকিৎসায় বিশেষভাবে উপকারী। তাই আজ থেকে কিশমিশ খাওয়া শুরু করুন, দেখবেন অনেক উপকার পাবেন।

১১.ওজন বাড়াতে

কিশমিশে প্রচুর ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ থাকে। তাই এটি ওজন বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যদি সঠিক নিয়মে ওজন বাড়াতে চান তবে আজই কিশমিশ খেতে পারেন।

১২.মস্তিষ্কের জন্য উপকারি

কিশমিশে থাকা বোরন মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারি। বোরন ধ্যান বাড়াতে সহায়ক। ফলে কাজে মনোযোগ বাড়ে। এটি বাচ্চাদের পড়াশোনাতেও মনোযোগী করে তুলতে পারে।

১৩.ডায়াবেটিস প্রতিরোধ

শুনতে আশ্চর্য লাগলেও, কিছু কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে যে কিশমিশ পোস্টপ্রান্ডিয়াল ইন্সুলিন রেস্পন্সকে নামিয়ে দেয়, যার মানে দাঁড়ায় যে কিশমিশ খেলে লাঞ্চ বা ডিনারের পরে শরীরে যে ইনসুলিনের হঠাত্‍ বৃদ্ধি বা ঘাটতি দেখা দেয়, তা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। লেপটিন আর ঘ্রেলিন নামক দুটি হোরমোনের রিলিজেও কিশমিশ সাহায্য করে, যেগুলি শরীরকে সিগনাল দেয় কখন খিদে পেয়েছে বা কখন যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তাই কিশমিশ খেলে অত্যাধিক খাওয়া রোধ করা সম্ভব।

তবে অধিক পরিমাণে কিশমিশ খেলে সমস্যা হতে পারে, তাই অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাবেন, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা। কারণ ফ্রুক্টোজ বা গ্লুকোজ ডায়াবেটিসের রুগীর জন্য মারাত্মক হতে পারে।

কিসমিস খাওয়ার সঠিক নিয়ম

শুকনো কিসমিস খাওয়ার চাইতে ভেজানো কিসমিস খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী। তাই বলে শুকনো অবস্থায় একেবারে যে খাওয়া যাবে না তা কিন্তু না। বাজার থেকে কিনে এনে ভালো করে ধুয়ে ৫-৬টি কিসমিস খেতে পারবেন নিশ্চিন্তে। প্রতিবার খাওয়ার আগে অবশ্যই ধুয়ে নিবেন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিসমিসের পুষ্টিগুণ ষোল আনা পেতে চাইলে সারারাত ভিজিয়ে রেখে খাওয়া উচিত। ১ কাপ জলে ৮-১০ টি কিসমিস ভালো করে ধুয়ে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন। বেশিক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে এর রং অনেক গাঢ় দেখাবে। যত গাঢ় হবে তত ভালো পুষ্টি উপাদান কাজ করবে। সকালে খালি পেটে ভেজানো কিসমিসগুলো খাবেন। 

কিসমিসের জলটা কিন্তু ফেলবেন না৷ সারারাত ভিজিয়ে রাখার ফলে জলেও কিসমিসের বেশ কিছু পুষ্টিগুণ মিশে গেছে। জলটা হালকা আঁচে একটু গরম করে খালি পেটে খেয়ে নিন। কিসমিস ও এর জল খাওয়ার আধা ঘন্টা পরে অন্য খাবার খাবেন।

পোলাও, ফিরনি, সেমাই, পায়েস, জর্দা, কোরমা ইত্যাদি খাবার মুখরোচক করতে কিসমিসের জুড়ি নেই। এসব খাবারে কিসমিস দিয়ে রান্না করতে পারেন। তাতে স্বাদটাও বাড়বে আবার দেহও পুষ্টি পাবে।