করলা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা - Benefits and harms of eating bitter gourd
bitter gourd

করলা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

করলা (করল্লা, উচ্ছা, উচ্ছে) এক প্রকার ফল জাতীয় সবজি। যা Cucurbitaceae পরিবারভুক্ত এক প্রকার লতা জাতীয় উদ্ভিদ। 

করলা তেতো স্বাদযুক্ত এবং এর শরীর কাঁটার মত ওয়ার্টে ভরা। পরিণত ফল লম্বাটে, রঙ কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে কমলা বা লাল, দৈর্ঘ্য ১২-২৫ সেন্টিমিটার (৫-১০ ইঞ্চি), প্রস্থ ৫-৭ সেমি হয়ে থাকে। করলা কেটে লবণ জলে ডুবিয়ে রাখলে তিক্ততা কমে। দক্ষিণ এশীয় এই সবজি এখন সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে ক্রান্তীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইংরেজি নাম: Balsam pear, alligator pear, bitter gourd, bitter melon, bitter cucumber

বৈজ্ঞানিক নাম: Momordica charantia 

পুষ্টি গুণাগুণ

প্রতি ১০০ গ্রাম করলায় বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ-

কার্বোহাইড্রেট  : ৩.৭০ গ্রাম,

প্রোটিন : ১ গ্রাম,

ফ্যাট : ০.১৭ গ্রাম,

খাদ্য আঁশ : ২.৮০ গ্রাম,

নায়াসিন : ০.৪০০ মিলিগ্রাম,

প্যান্টোথেনিক এসিড : ০.২১২ মিলিগ্রাম,

ভিটামিন এ : ৪৭১ আই ইউ,

ভিটামিন সি: ৮৪ মিলিগ্রাম,

সোডিয়াম ; ৫ মিলিগ্রাম,

পটাশিয়াম : ২৯৬ মিলিগ্রাম,

ক্যালসিয়াম : ১৯ মিলিগ্রাম,

কপার : ০.০৩৪ মিলিগ্রাম,

আয়রন: ০.৪৩ মিলিগ্রাম,

ম্যাগনেসিয়াম : ১৭ মিলিগ্রাম,

ম্যাঙ্গানিজ: ০.০৮৯ মিলিগ্রাম,

জিংক : ০.৮০ মিলিগ্রাম।


করলা খাওয়ার উপকারিতা

১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা:

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় করলা রাখলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশ উন্নতি ঘটবে। প্রতিদিন ১০০ গ্রাম করলা খেলে করলায় থাকা বিভিন্ন উপাদানা শরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এতটাই শক্তিশালী করে দেয় যে ছোট বড় অনেক রোগই ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।

২. ওজন কমায়:

করলার একটি অল্প ক্যালোরিযুক্ত খাবার। করলার সুষম উপাদান ওজন কমানোয় যাদুকরী ভূমিকা পালন করে।

৩. লিভারের কার্জ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে:

গবেষনায় জানা যায়, করলা খাওয়া মাত্র শরীরে বিশেষ কিছু এনজাইমের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে যার কারণে লিভারের কার্জর্ ক্ষমতা বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, করলায় উপস্থিত উপাদান লিভার ফেলিওর হওয়ার সম্ভাবনাকেও কমি দেয়।

৪. হজম শক্তি বাড়ায় :

করলা খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ খাবার। এতে করে খাবার হজম ভালো হয় এবং পেটও পরিষ্কার থাকে। সেই সাথে অ্যাসিডিটির সমস্যা কমায়।

৫. ত্বকের সৌন্দর্যে:

করলার ব্যবহার স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ত্বকের জন্যও উপকারী হতে পারে। একটি গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে করলা পাতার পেস্ট ত্বকের রোগ থেকে মুক্তি দেয়। এর কাঁচা ফল অর্থাৎ কোমল করলা ব্রণ কমাতে পরিচিত। এছাড়াও, কানতোলার ভাজা বীজ একজিমা এবং অন্যান্য ত্বক-সম্পর্কিত সমস্যা এর জন্য উপকারী হতে পারে।

শুধু তাই নয়, করলা মূলের গুঁড়ো ব্যবহার ত্বকের জন্যও উপকারী। এটি মুখে লাগালে ত্বক নরম হয়ে যায়। এছাড়াও, এটি ত্বকে ঘাম কমাতে পারে। এই সুবিধাগুলির জন্য কোন উপাদান এবং বৈশিষ্ট্যগুলি সহায়ক তা এখনও স্পষ্ট নয়।

৬. ডায়াবেটিস রোগে:

করলায় রয়েছে রক্তে চিনি কমানোর উপাদান। ডায়াবেটিস রোগীরা রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত করলা খেতে পারেন।

৭. ফুসফুস ভাল রাখতে:

করলার রস মধুর সাথে মিশিয়ে খেলে ফুসফুস ভালো থাকে। এই রস অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস ও গলার প্রদাহে উপকার করে। অর্থ্যাৎ শ্বাস জনিত সকল সমস্যা দূর করতে করলা বেশ কার্যকর।

৮. ক্যান্সার প্রতিরোধে:

করলায় উপস্থিত বেশ কিছু উপাদান শরীরে ক্যান্সার সেল যাতে জন্ম নিতে পারে সেদিকে নজর রাখে। ফলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায় এবং ক্যান্সারের নতুন কোষ জন্মে বাধা প্রদান করে।

৯. উচ্চ রক্তচাপে:

করলা অ্যানিমিয়া এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের চিকিৎসাতে বেশ ভাল কাজ করে।

১০. গায়ের বল বাড়াতে:

করলার রস শক্তিবর্ধক হিসেবেও কাজ করে। এটি শরীরের স্ট্যামিনা বাড়ানোর পাশাপাশি রাতে ভালো ঘুমে সহায়তা করে।

১১. রক্ত পরিস্কারক:

সুস্থ ভাবে বাঁচতে হলে চাই পরিশুদ্ধ রক্ত। তাই সুস্থভাবে বাঁচতে রক্তের পরিশুদ্ধতার দিকে খেয়াল দেয়া জরুরী। প্রতিদিন করলা খাওয়ার গড়ে তুলুন। তাহলেই উপকার মিলবে। কারণ এই সবজিটিতে উপস্থিত ব্লাড পিউরিফাইং এজেন্ট রক্তকে পরিশুদ্ধ রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

১২. পেটের রোগ সারাতে:

করলায় থাকা প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, যা কনস্টিপেশনের মতো রোগের প্রকোপ কমানোর পাশাপাশি নানাবিধ স্টমাক ডিজঅর্ডারের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। খাদ্য আঁশ শরীরে প্রবেশ করা মাত্র গ্যাস্ট্রিক জুসের ক্ষরণ বাড়িয়ে। ফলে নানাবিধ পেটের রোগ কমতে শুরু করে।

১৩. দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখতে:

কাঁচা করলা অথবা করলার রস খাওয়া শরীরে করলে শরীরে প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন সি, বিটা-ক্যারোটিনের ঘাটতি পূরণ করে, যা দৃষ্টিশক্তির উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আজকাল মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, কর্মব্যস্ততা ইত্যাদির কারণে আমাদের চোখের উপর অনেক চাপ পড়ছে। তাই চোখকে বাঁচাতে করলা খাওয়া প্রয়োজন।

১৪. পাইলস সারাতে:

প্রতিদিন সকালে ১০০ গ্রাম করলা খান। দেখবেন এক মাসেই পাইলসের যন্ত্রণা একেবারে কমে যাবে। কাঁচা করলা খাওয়ার পাশাপাশি করলা গাছের মূল বেটে পেস্ট তৈরী করে সেই পেস্ট পাইলসের উপর লাগাতে পারলে আরও তাড়াতাড়ি উপকার পাওয়া যায়।

১৫. গুঁড়া কৃমির উপদ্রবে:

গুঁড়া কৃমির উপদ্রবে প্রতিদিন সকাল বিকাল করলা/উচ্ছে পাতার রস ১-২ চামচ করে খেলে কৃমির উপদ্রব শেষ হয়ে যায়।

১৬. অরুচি দূর করতে:

কোন কারণ ছাড়াই মুখে অরুচি। এমতাবস্থায় করলা পাতার রস সকাল বিকাল ১-২ চামচ করে খেলে অরুচি দূর হয়, ক্ষুধা বাড়ায়, হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।

১৭. এলার্জি সারাতে:

এলার্জি সারাতে প্রতিদিন সকাল বিকাল ২ চামচ করে করলা পাতার রস খেলে এলার্জি ভাল হয়।

১৮. পুরনো ঘা:

পুরনো ঘা শুকাচ্ছে না। এমতাবস্থায় করলা শুকিয়ে গুঁড়ো করে ক্ষত স্থানে লাগাতে হবে। করলার লতা পাতা সিদ্ধ পানি দিয়ে ঘা ধুয়ে দিতে হবে। তাহলে অল্প দিনেই ঘা শুকিয়ে যাবে।

১৯. বসন্ত সারাতে:

বসন্ত রোগে .০৫-১৩ গ্রাম হলুদের গুঁড়ার সাথে ১ চা চামচ করলা পাতার রস মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে করে গুটি তাড়াতাড়ি বের হবে এবং শুকিয়ে যাবে।

২০. বাত সারাতে:

৩ চামচ উচ্ছে পাতার রস একটু গরম করে তাতে পানি মিশিয়ে সকাল বিকাল খেলে বাত ব্যথায় উপকার পাওয়া যায়।

করলা খাওয়ার অপকারিতা

করলার স্বাস্থ্য উপকারিতার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও থাকতে পারে। এই কারণে করলা শুধুমাত্র পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। এখানে আমরা এটির অতিরিক্ত ব্যবহারে করলার ক্ষতি সম্পর্কে কথা বলছি।

করলা খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যেতে পারে। যাদের শর্করার সমস্যা কম তারা চিকিৎসকের পরামর্শেই এটি গ্রহণ করুন।

এর মূলে শুক্রাণু নাশক এবং প্রজননরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

সংবেদনশীল ব্যক্তিদের করলায় অ্যালার্জি হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে সেবন করুন।