ধনেপাতার উপকারিতা ও অপকারিতা - Benefits and harms of coriander leaves
Coriander leaf

ধনেপাতার উপকারিতা ও অপকারিতা

শীত পড়তে শুরু করেছে। এরইমধ্যে বাজারে উঠে গেছে ধনেপাতা। অনেকেই তরকারির স্বাদ বাড়াতে ধনেপাতা ব্যবহার করেন। আবার ভর্তায়ও জায়গা করে নেয় এই সুগন্ধি পাতা। এ তো গেল রসনাবিলাসের কথা। কিন্তু জানেন কি, খাবারে স্বাদ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধনেপাতার রয়েছে একগুচ্ছ ঔষধি গুণ।

ধনিয়া বা ধনেপাতা একটি সুগন্ধি ঔষধি গাছ। ধনিয়া পাতার বৈজ্ঞানিক নাম Coriandrum sativum. এটি একটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ।দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র ধনের বীজ খাবারের মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সুস্বাদু ধনের পাতা বাংলাদেশী চাটনি ও মেক্সিকান সালসাতে ব্যবহার করা হয়। ধনে পাতাকে আমরা সালাদ এবং রান্নার স্বাদ বাড়ানোর কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু শুধু স্বাদ এবং ঘ্রাণ বাড়ানোর কাজেই এর গুণাগুণ শেষ হয়ে যায় না। এ পাতা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো একটি তৃণ জাতীয় খাবার।

ধনেপাতার পুষ্টিগুণ

ধনেপাতার পুষ্টিগুণ অনেক। চার গ্রাম ধনেপাতায় ০.৯ কিলোক্যালোরি পাওয়া যায়, যাতে রয়েছে ০.২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ০.১ গ্রাম প্রোটিন এবং ০.১ গ্রাম ফাইবার। এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও আয়রন। এসব পুষ্টি উপাদানের কারণে ধনেপাতার পুষ্টিগুণ বা স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক।

ধনেপাতার উপকারিতা 

অনেকেই আমরা ধনে পাতার উপকারিতা না জেনেই নিয়মিত বিভিন্ন তরকারিতে ব্যবহার করে আসছি। চলুন আজ জেনে নেই ধনেপাতার উপকারিতা সম্পর্কে।

কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে

আমাদের দেহে এলডিএল নামক এক ধরনের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল থাকে, যা দেহের শিরা-উপশিরার দেয়ালে জমে হৃৎপিন্ডে রক্ত চলাচলে সমস্যা বাড়ায়। এর কারণে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ধনেপাতা এই ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয় । আবার দেহের জন্য ভালো বা উপকারি এক ধরনের কোলেস্টেরল, এইচডিএল-এর মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে শরীর সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে এই ধনেপাতা। ধনেপাতায় থাকা আয়রন রক্ত তৈরি বা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। ধনেপাতায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন-কে। এই কারনে ধনেপাতা কোলেস্টেরলমুক্ত। ফলে দেহের চর্বির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ধনেপাতা। ধনেপাতা রক্ত পরিষ্কার করতেও অনেক সাহায্য করে।

রূপচর্চায় ধনে পাতা

রূপচর্চায়ও অনেক উপকারি এই ধনেপাতা। ত্বক ও চুলের ক্ষয়রোধ করে থাকে। ধনে পাতায় রয়েছে ভিটামিন এ , ভিটামিন সি, ফসফরাস ও ক্লোরিন। তাই প্রাকৃতিক ব্লিচ হিসেবে ধনে পাতা দারুন ভূমিকা। যাদের ঠোঁটে কালো দাগ আছে তারা রোজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ধনে পাতার রসের সাথে দুধের সর মিশিয়ে ঠোঁটে লাগিয়ে রাখলে, এইভাবে এক মাস লাগালে ঠোঁটের কালো দাগ দূর হবে আর ঠোঁট কোমল ও সুন্দর হবে। এছাড়া ধনাপাতা ইউরিন ইনফেকশন প্রতিরোধ করে থাকে।ধনে পাতায় আরো রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইবার, আয়রন, ফ্লেভোনয়েড, ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান যা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। শীতকালীন ঠোঁট ও ত্বক ফাটা, ঠান্ডা লাগা, জ্বর জ্বর ভাব অনুভব হওয়ার ক্ষেত্রে বন্ধুর মতো কাজ করে এই পাতা। পরিমাণমতো ধনেপাতা খেলে তারুণ্য ধরে রাখা যায়।

ধনের বীজের গুনাগুন

ধনে গাছের বীজেরও রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। অর্থাৎ এরও রয়েছে ওষুধি গুণ। যেমন এর বীজের তেল ব্যাথানাশক, খাবার হজমে সহায়ক, ছত্রাকনাশক, খিদে বাড়ানোর ক্ষেত্রেও যথেষ্ট কাজ দেয়। ধনে পাতার রস দিয়ে দাঁত মাজলে মাড়ি মজবুত হয়। রক্ত পড়া বন্ধ করে ও মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। সাধারণত গ্যাসট্রিকের সমস্যা থাকলে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। ধনে গুঁড়ো তরকারিতে মসলা হিসেবে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে বিভিন্ন দেশে। চিবিয়ে খাওয়া যায় গোটা ধনের বীজ।

পাকস্থলির সমস্যায় ধনে পাতা

ধনেপাতা শরীর ঠান্ডা রাখে এবং হজমে সাহায্য করে। আরো অনেক ক্ষেত্রে ধনে পাতা উপকার করে যেমন পেট ফাঁপা ও পাকস্থলির বিভিন্ন সমস্যা দূর করে হজমশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। ধনেপাতা ক্ষুধা বৃদ্ধি করেও থাকে এবং বায়ুনাশক।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ

পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, ধনে পাতা কেবল সৌন্দর্য আর স্বাদ বাড়াতেই অনন্য নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ উপকারী। ধনে পাতা রক্তে চিনির পরিমাণ কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে।

মেয়েদের মাসিকেও কার্যকর

মেয়েদের মাসিকে অতিরিক্ত ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনতেও ধনে পাতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পাঁচশ মিলিলিটার পানিতে ছয় গ্রাম ধনে পাতা ফুটিয়ে নিতে হবে। এরপর ওই গরম পানিতে এক টেবিল চামচ চিনি ভালোভাবে মিশিয়ে খাইলে মাসিকের অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ নিরাময় করা যায়।

চুলকানি-পাঁচড়ায় ধনেপাতা

দেহের কাটা-ছেঁড়া অংশগুলো দ্রুত শুকানোর জন্য খুবই উপকারি এই উপাদান। দেহের চুলকানি-পাঁচড়ায় ধনেপাতার রস লাগালে তাড়াতাড়ি ভলো হয়ে যায়। অপারেশন বা আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা দ্রুত নিরাময় করে এই ধনেপাতা।

দাঁতের রক্ত পড়া বন্ধতে

ধনেপাতা রক্ষা করে মুখের ভেতরের নরম অংশগুলোকে। এমনকি লড়াই করে মুখগহবরের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও। ধনেপাতা চিবিয়ে রস বের করে তা দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয় খুব দ্রুত। সাথে মাড়িও শক্ত করতে সাহায্য করে ধনেপাতা।

মস্তিষ্কের রোগ নিরাময়ে

ধনেপাতায় রয়েছে আলজিমারস নামক পদার্থ। এই পদার্থ মস্তিষ্কে রোগ নিরাময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। ফলে ধনেপাতার গুনাগুনের জন্য মস্তিষ্কে কোন রোগ ঠিকভাবে বাসা বাধতে পারে না।

হাড় মজবুত করতে

হাড় মজবুত করতে ধনেপাতার গুন তো বলে শেষ করা যায় না। এটি হাড়কে মজবুত করে। সুতরাং ধনেপাতা নিয়মিত পরিমাণমত খাওয়া উচিত।

বাতের ব্যথা উপশমে

বাত ব্যথাই ধনেপাতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল মানুষের বাত এর সমস্যা থাকে। তারা যদি পরিমাণমত নিয়মিত ধনেপাতা খাই তাহলে বাত রোগ নিরাময় করতে পারবে। যেভাবে খেতে হবে- ধনে পাতা সিদ্ধ করে সেই পানি খেলে বাতের ব্যথা সেরে যায়।

চোখের রোগ নিরাময়ে

ধনেপাতাই ভিটামিন-এ থাকে প্রচুর পরিমাণে। আর চোখের পুষ্টি জোগায় এই ভিটামিন-এ। যাদের রাতকানা রোগ আছে। তাদের জন্য ধনেপাতা অনেক উপকার। রাতকানা রোগ দূর করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে ধনেপাতা।

অর্শরোগে রক্ত বন্ধ করতে

অর্শরোগে ধনেপাতা অনেক সহায়ক। ধনেপাতার বেটে সেই রস খেলে অর্শরোগীর রক্ত পড়া বন্ধ হয়।

অরুচি বাড়াতে সহায়ক

ধনেপাতা অত্যন্ত স্বাদময় সবজি। আর এই ধনেপাতা বেটে ভর্তা করে খেলে মুখের রুচি বাড়াতে সাহায্য করে। দেহের পিত্তও ঠান্ডা রাখে ধনেপাতা।

ধনে পাতা খাওয়ার অপকারিতা

রোজকার একঘেয়ে রান্নায় একটু খানি ধনে পাতা। ব্যাস স্বাদ -গন্ধ দুটোই এক নিমেষে বদলে যায়। ধনেপাতার বৈজ্ঞানিক নাম কোরিয়েন্ড্রাম সেটিভা। আসলে ধনেপাতার বিভিন্ন ওষধি গুণ থাকার পাশাপাশি কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি করলেও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকরও এই ধনে পাতা। আসুন জেনে নেই ক্ষতিকর দিকগুলো।

লিভারের ক্ষতি

অতিরিক্ত ধনেপাতা খেলে এটি লিভারের কার্যক্ষমতাকে খারাপভাবে প্রভাবিত করে থাকে। এতে থাকা এক ধরনের উদ্ভিজ তেল শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে ফেলে। এছাড়া এটাতে এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে, যেটা সাধারণত লিভারের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। কিন্তু দেহের মধ্যে এর অতিরিক্ত মাত্রার উপস্থিতি লিভারের ক্ষতিসাধন করে।

নিম্ন রক্তচাপ সৃষ্টি

অতিরিক্ত ধনেপাতা খাওয়ার ফলে হৃৎপিন্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি নিম্ন রক্তচাপ সৃষ্টি করে। চিকিৎসকরা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ধনেপাতা খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অতিরিক্ত খেলে সেটা নিম্ন রক্তচাপের সৃষ্টি করে। এছাড়া এটি মাথাব্যথারও কারণ হতে পারে।

পেট খারাপ

স্বাভাবিকভাবে ধনেপাতা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল বিষয়ক সমস্যা দূর করে থাকে। কিন্তু বেশি পরিমাণে ধনেপাতা খেলে পাকস্থলীর হজমক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করে। এক গবেষণা বলছে, সপ্তাহে ২০০ গ্রামের বেশি ধনেপাতা খেলে তা গ্যাসের ব্যথা, পেটে ব্যথা, পেট ফোলা, বমি হওয়া এমনকি ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।

শ্বাসকষ্ট বাড়ায়

শ্বাসকষ্টের রোগীদের ধনেপাতা খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেন চিকিৎসকরা। কেননা এটি শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা করে। যার ফলে ফুসফুসে অ্যাজমার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। শ্বাসকষ্টের রোগীরা ধনেপাতা খেলে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা তৈরি হয়।

বুকে ব্যথা

অতিরিক্ত ধনেপাতা খেলে বুকে ব্যথার মত জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা শুধুমাত্র অস্বস্তিকর ব্যথাই সৃষ্টি করে না তা দীর্ঘস্থায়ীও করে।এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে দৈনন্দিন আহারে কম পরিমাণে ধনেপাতা খেতে পারেন।

ত্বকের সংবেদনশীলতা

সবুজ ধনেপাতাতে মোটামুটিভাবে কিছু ঔষধি অ্যাসিডিক উপাদান থাকে যেটি ত্বককে সূর্যরশ্মি থেকে বাঁচিয়ে সংবেদনশীল করে থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত সেবনে সূর্যের রশ্মি একেবারেই ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ত্বক ভিটামিন ‘কে’ থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া ধনেপাতা ত্বকে ক্যানসারও তৈরি করে থাকে।

অ্যালার্জির সমস্যা

ধনেপাতার প্রোটিন উপাদানটি শরীরে আইজিই নামক অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানকে সমানভাবে বহন করে থাকে। কিন্তু এর অতিরিক্ত মাত্রা উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে অ্যালার্জীর তৈরি হয়। এই অ্যালার্জীর ফলে দেহে চুলকানি, ফুলে যাওয়া, জ্বালাপোড়া করা, র‌্যাশ ওঠা ইত্যাদি সমস্যা তৈরি করে।

মুখ ব্যথা

অতিরিক্ত ধনেপাতা খাওয়ার আর একটি ক্ষতিকর দিক হল মুখে ব্যথা হওয়া। ধনেপাতায় বিভিন্ন এসিডিক উপাদান রয়েছে, যা ত্বককে সংবেদনশীল করে থাকে। পাশাপাশি এটি মুখে প্রদাহেরও সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ঠোঁট, মাড়ি এবং গলা ব্যথা হওয়া। সারা মুখ লালও হয়ে যেতে পারে।

ভ্রূণের ক্ষতি

নারীদের গর্ভকালীন সময়ে অতিরিক্ত ধনেপাতা খাওয়া ভ্রূণের বা বাচ্চার শরীরের জন্য বেশ ক্ষতিকারক। ধনেপাতাতে থাকা কিছু উপাদান নারীদের প্রজনন গ্রন্থির কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে ফেলে। যার ফলে নারীদের বাচ্চাধারণ ক্ষমতা হৃাস পায়। বাচ্চাধারণ করলেও গর্ভকালীন ভ্রূণের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।