বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর-Police Museum of liberation war
Bangladesh Police Muktijuddho Jadughar

বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর-Liberation War Museum of Bangladesh Police

রাজারবাগে পুলিশ অডিটোরিয়াম ভবনের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘরে সংরক্ষণ করা প্রত্যেকটি স্মারক সাক্ষ্য দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের জানা-অজানা কাহিনি। এ যেন এক যুদ্ধ স্মৃতির বাতিঘর। মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র থ্রি নট থ্রি রাইফেল, মর্টার শেল, হাতব্যাগ, টুপি, চশমা, মানিব্যাগ, পাক বাহিনীর আক্রমণের খবর বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে পাঠানোর ওয়্যারলেস সেট। এমনকি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ব্যবহৃত পিস্তলটিও আছে এখানে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পুলিশের প্রথম প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্মারক নিয়েই বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবস্থিত এই চেতনার বাতিঘর। এই জাদুঘরটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনেক শিক্ষণীয়ও বটে। তবে ‘পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ মানে পুলিশের জন্যই নয়। অনেকেই জানেনই না এটি সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছিল ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধও শুরু হয় রাজারবাগ থেকে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের ওই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে স্থাপিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’।

২০১৩ সালের ২৪ মার্চ জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের টেলিকম ভবনে। পরে ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ স্মৃতিস্তম্ভের ঠিক পাশেই নব-নির্মিত জাদুঘর ভবনের উদ্বোধন করেন।


ইতিহাস:

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াল কালরাত। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গোলাবর্ষণ শুরু করে পুলিশ লাইন্স ঘিরে। ভিতরে তখন আটকা বাঙালি পুলিশ সদস্যরা। আধুনিক সমরাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের হাতিয়ার পুরোনো বন্দুক বা থ্রি নট থ্রি রাইফেল। তৎকালীন আইজিপির দেহরক্ষী কনস্টেবল আব্দুল আলীর পাগলা ঘণ্টা ধ্বনিতে তা নিয়েই গর্জে উঠলেন বীর পুলিশ সদস্যরা। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিপক্ষে প্রাণপণ লড়াই চললো কয়েক ঘণ্টা। সেই রাতে শহীদ হলেন কমপক্ষে দেড়শ বাঙালি পুলিশ সদস্য।

সেই যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নসহ দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের বীরত্বের স্মৃতিগাথা তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। স্মৃতিস্তম্ভের পাশে দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এ জাদুঘরে আছে মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদানের নানান স্মারক।

২০০৯ সালে তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ (বর্তমানে এমপি) ও ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার একেএম শহীদুল হকের (সাবেক আইজিপি) সঙ্গে পরামর্শ করে পুলিশের তৎকালীন ডিসি মো. হাবিবুর রহমান (বর্তমানে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি) জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। মিলিটারি একাডেমি পরিদর্শন করে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগও নেন মো. হাবিবুর রহমান। ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের টেলিকম ভবনে দুটি রুম নিয়ে প্রথম পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়।


যা যা দেখবেন:

স্থাপনার দিক থেকেও নান্দনিক এ জাদুঘরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি। গ্যালারির দুই পাশের দেয়ালে আছে বঙ্গবন্ধুর নানা সময়ের দুর্লভ সব আলোকচিত্র। পাশেই মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা প্রায় দুই হাজার বইয়ের সমন্বয়ে এক মনোরম লাইব্রেরি। যে কেউ মনোরম পরিবেশে লাইব্রেরিতে বসে বই পড়তে পারবেন। এছাড়া এখানে মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান বিষয়ে লেখা বিভিন্ন বই কেনারও ব্যবস্থা রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু গ্যালারির ঠিক মাঝ বরাবর গোলাকার দুটি সিঁড়ি নেমে গেছে জাদুঘরের মূল কক্ষে। জাদুঘরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের বিশাল সংগ্রহশালা। যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন পুলিশ বাহিনীর নানান স্মৃতিচিহ্ন, অস্ত্র, পোশাক, দলিল-দস্তাবেজ। এমনকি বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ব্যবহার করা রিভলবারটিও সংরক্ষিত আছে এ জাদুঘরে।


পাগলা ঘণ্টা

পাকা লোহার একটা দণ্ড—এটাই পাগলা ঘণ্টা। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পুলিশ লাইনস আক্রমণের মুহূর্তে এই পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে পুলিশ সদস্যদের একত্র করে প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়। সেখানে ঝুলিয়ে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, পাগলা ঘণ্টার আওয়াজ শুনে রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা সালামি গার্ডের পাশে জড়ো হন এবং অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে প্রতিরোধ গড়তে অবস্থান নেন। পাগলা ঘণ্টা বাজানোর কাজটি করেছিলেন পুলিশ সদস্য আবদুল আলী।

বেতারযন্ত্র

রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের খবর পাঠানো হয় কন্ট্রোল রুমে রাখা এই বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ‘হেলিকপ্টার ব্যাজ’ মডেলের একটি বেতারযন্ত্র থেকে এই বার্তাটি পাঠান সে সময়ের বেতার অপারেটর মো. শাহজাহান মিয়া।

স্মৃতির বেঞ্চ

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আহত দুই পুলিশ সদস্যকে নেওয়া হয় মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনির হাসপাতালে। সে মুহূর্তে হাসপাতালে কোনো শয্যা ছিল না। তাঁদের দুজনকে এ দুটি বেঞ্চের ওপর রেখেই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়ে অজ্ঞাত ওই দুই পুলিশ সদস্য সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।


থ্রি নট থ্রি রাইফেল

সেই কালরাতে পুলিশ সদস্যদের হাতে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল। পাকিস্তানি বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে এই অস্ত্র দিয়েই লড়েছিলেন বাঙালি পুলিশ সদস্যরা। 

বীরদের স্মারক

মুক্তিযুদ্ধের সময় পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত রাইফেল, বন্দুক, মর্টার শেল, হাতব্যাগ, টুপি, চশমা, মানিব্যাগ, অণুবীক্ষণযন্ত্র, সার্চলাইট, ট্রাংক ও ইউনিফর্ম রাখা হয়েছে। দেয়ালজুড়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের যুদ্ধের সময়ের ডায়েরি, হাতে লেখা বিভিন্ন বার্তা, আলোকচিত্র ও পোস্টার। এর মধ্যেই পাওয়া যাবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত নানা জিনিস। সেসব স্মারকের তালিকায় রয়েছে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদের ব্যবহৃত রেডিও ও ডায়েরি। শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাবা। 


সময়সূচী ও টিকেট মূল্য:

এ জাদুঘরে প্রবেশ টিকিটের মূল্য ১০ টাকা। বুধবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ৬ দিনই খোলা থাকে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও বেলা ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা বিরতি। শুক্রবারও বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে।

গ্রীষ্মকালে (মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং শীতকালে (অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। তবে ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের জন্য এবং সব জাতীয় দিবসে সবার জন্য বিনামূল্যে জাদুঘর ঘুরে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। 

তথ্যসূত্র: jagonews24.com
বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর-Bangabandhu Military Museum
বাংলাদেশ ডাক জাদুঘর-Postal Museum
টাকা জাদুঘর-Taka Museum
জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর-National Museum of Science and Technology
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর-Bangabandhu Memorial Museum