গাদীর খুম কি এবং এ সম্পর্কীত হাদীস - What is Ghadir Khumm and hadiths related to it
Ghadir Khumm

গাদীর খুম কি এবং এ সম্পর্কীত হাদীস - What is Ghadir Khumm and hadiths related to it

রাসূল পাকের (সা.) পার্থিব কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তার অবর্তমানে নবুয়্যতি কার্যক্রম পরিচালনার উপযুক্ত প্রতিনিধি দরকার। তাই হজরত আলীকে আল্লাহর প্রতিনিধি করার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে। রিসালাতের কাজে রাসূল পাকের (সা.) পরে আলীই হলেন তার একমাত্র যোগ্য প্রতিনিধি।

নবীজি বিদায় নিচ্ছেন। তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি। তাই তার অবর্তমানে তার দায়িত্বে স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন আলী (রা.)। কেননা রাসূলে পাক (সা.) (জীবনে একবার মাত্র) পবিত্র হজব্রত সম্পন্ন করে প্রিয় জন্মভূমি মক্কা শহরকে চিরবিদায় দিয়েছেন বলে একে ‘বিদায় হজ’ বলা হয়। রাসূলে পাক (সা.) হজব্রত পালন করে মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথে ১৮ জিলহজ তারিখে ‘গাদিরে খুমে’ (গাদির অর্থ জলাশয়, খুম-স্থানের নাম) অর্থাৎ খুমের জলাশয়ের কাছাকাছি হলে কোরআনের সর্বশেষ আয়াতের ঠিক আগের আয়াতটি নাজিল হয়। আয়াতটি হল-

‘ইয়া আয়্যুহার রাসূল বাল্লিগ মা-উনজিলা ইলাইকা মির রব্বিকা। ওয়া ইললাম্ তাফআ’ল ফামা বাল্লাগতা রেসালাতাহু। আল্লাহু ইয়া সিমুকা মিনান্নাস। ইন্নাল্লাহা লা-ইয়াহদিল কাওমাল কাফিরিন।’

অর্থ : হে রাসূল, আপনার রব থেকে যা নাজিল করা হয়েছে তা পৌঁছিয়ে দিন। আর যদি তা না করেন তাহলে তাঁর (আল্লাহর) রিসালাত পৌঁছিয়ে দেয়া হল না। আল্লাহ আপনাকে মানবমণ্ডলী থেকে নিয়ে আসবেন। নিশ্চয় আল্লাহপাক কাফের দলকে হেদায়েত করেন না।

আয়াতটি আলীর মাওলাইয়াত ঘোষণা করার বিষয়ে অবতীর্ণ যা বাস্তবায়িত না করলে আল্লাহর রিসালাতই অপূর্ণ থেকে যায়। সুতরাং সঙ্গত কারণেই রাসূলে খোদা (সা.) গাদিরে খুমে থেমে গেলেন এবং এই অহির নির্দেশক্রমে প্রায় সোয়া লাখ সাহাবির উপস্থিতে অনাড়ম্বর পরিবেশে মোমিনে বা বিশ্বাসীদের প্রতিনিধি বা ‘মাওলা’ হিসেবে হজরত আলীকে তার স্থলাভিষিক্ত করে নেন। এরপর রাসূলে পাক (সা.) তার প্রার্থনায় বলেন :

‘মানকুনতুম মাওলাহু ফাহাজা আলীউন মাওলাহু।

আল্লাহুম্মা ওয়ালে মান ওয়ালাহু, আদামান আদাহু, অনসুর মান নাসারা, অখজুল মান্ খাজালা, ফাল্ইয়াস হাদিল, হাজিরুন খাইরা।’

অর্থাৎ আমি যার মাওলা এই আলী তার মাওলা। হে আল্লাহ, তুমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো যে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, যে তার সঙ্গে শত্রুতা করে লাঞ্ছনা দাও তাকে।

এরপর ‘মাওলাল মোমিনিন’ বা বিশ্বাসীগণের ‘মাওলা’ হিসেবে হজরত আলী ইবনে আবি তালিবকে রাসূলে পাক (সা.) তার স্থলাভিষিক্ত করে গাদিরে খুমে যে অভিষেক অনুষ্ঠান করেন, ইতিহাসে তা ‘গাদিরে খুম’ বা ‘ঈদে গাদির’ নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক গাদিরে খুমের এ ঘটনা স্বীকৃতি রয়েছে বিভিন্ন তফসির (কাশ্শাফ) ও হাদিস (বোখারি ও মেশকাত) গ্রন্থে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত গ্রন্থাদিতেও (যেমন হজরত আলীর (রা) জীবন ও খিলাফত) এই সত্যতার প্রমাণ রয়েছে।

গাদীরে খুম-সম্পর্কিত হাদীস

হাদীসে গাদীরে খুমের সারসংক্ষেপ: হযরতে ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র সেনাবাহিনী গনীমত হতে শণবস্ত্র ও উট দিতে অস্বীকার করায় তাঁর প্রতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন; আর তাঁরা এ বিষয়টির ব্যাপারেও খুশি ছিলেন না যে তিনি স্বয়ং খুমস্ তথা গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ হতে বিশেষ একটি অংশ (মঞ্জুরি) প্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিশ্চয় খুমস্ হতে অতিরিক্ত অংশের এ সুবিধা গ্রহণের জন্যে তাঁকে দোষারোপ করা যায় না, যে অধিকারটুকু ক্বুরআন মজীদেই প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র পরিবার সদস্যদের প্রতি দান করা হয়েছে। তথাপি সৈনিকবৃন্দের দৃষ্টিতে ছিলো রোষানল, তাই হযরতে ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) যখন খুমস্ হতে এক জারিয়া দাসীকে নিজের জন্যে গ্রহণ করেন তখন তাঁরা বিশেষভাবে মনে কষ্ট পান। বস্ত্র ও উট অস্বীকার করে নিজের জন্যে দাসী নারী গ্রহণের দায়ে তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে ভ্রান্তভাবে কপটতার অভিযোগ উত্থাপন করেন। এই অমূলক সমালোচনার কারণেই মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর পক্ষ সমর্থন করতে গাদীরে খুমের হাদীসটি ব্যক্ত করেন।

জনৈক ShiaChat সদস্য বলেন: “তোমরা সৌদি (মানে জাযিরাতুল আরবের) বিকৃত যৌনতায় বিশ্বাসী লোকেরা তোমাদের নিজস্ব বিলাসিতায় কারো সম্পর্কে যা কল্পনা করতে চাও করো গিয়ে, কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে এখানে কথা বলার দুঃসাহস দেখিও না.....ওই অভিযোগ (মানে ইমামে আলী কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু কর্তৃক জারিয়া দাসীর সাথে সহবাস করার বিষয়টি) একটি নির্লজ্জ উমাইয়া প্রপাগান্ডা, যাতে আমাদের মওলা (আলাইহিস্ সালাম)’কে মন্দ হিসেবে প্রতিপন্ন করা যায়।”

প্রথমতঃ  সহীহ বুখারী হাদীসগ্রন্থে গাদীরে খুম-বিষয়ক হাদীসটি হযরতে ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)‘কে মন্দ হিসেবে প্রতীয়মান করার উদ্দেশ্যে লিপিবদ্ধ হয়নি। বস্তুতঃ প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হযরত ইমাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর কাজটির পক্ষে সমর্থন জানান। এখানে উল্লেখ্য যে, এমন কী হুজূর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) নিজেও এক জারিয়া দাসীকে গ্রহণ করেছিলেন যা সুন্নী ও শীয়া হাদীসগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। সেই অতীত যুগে দাসত্ব এক সাংস্কৃতিক রীতি হিসেবে প্রচলিত ছিলো, আর প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) মুসলমানদের প্রতি দাসীদেরকে তাঁদের (আচরণে) স্ত্রীর মর্যাদা দেয়ার জন্যে তাকিদ দিয়েছিলেন। অন্যান্য সময়ে তিনি দাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করার উৎসাহ দান করতেন। এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে লেখা অনেক দীর্ঘ প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠকমণ্ডলী ইন্টারনেটে সেগুলো খুঁজে পড়তে পারেন।

দ্বিতীয়তঃ এ বিষয়টিও এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) কর্তৃক জারিয়া দাসী গ্রহণকে অনৈতিক বিবেচনা করার কারণে কিন্তু হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর সমালোচনা করেননি। বরঞ্চ তিনি সমালোচনামুখর হয়েছিলেন এ কারণে যে, হযরতে ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) খুমস্ থেকে অংশ নিলেও তাঁর সৈন্যদের তিনি তা হতে অংশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) খুমস্ থেকে জারিয়া দাসী গ্রহণ করেন, নাকি শণবস্ত্র বা উট নেন, সে ব্যাপারটি হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র কাছে ধর্তব্য ছিলো না।

তৃতীয়তঃ হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) কর্তৃক জারিয়া দাসী গ্রহণের বাস্তবতা শীয়া হাদীসগ্রন্থেও বিবৃত হয়েছে। এমতাবস্থায় শীয়াপন্থীদের এতো উষ্মা প্রকাশ করা কেন উচিৎ হবে, যখন অনুরূপ একটি বর্ণনা সুন্নী হাদীসগ্রন্থে বিবৃত হয়েছে? এটা কপটতা নয় কি? সুন্নী হাদীসে হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) কর্তৃক জারিয়া দাসী গ্রহণের প্রতি হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) যেমন রাগান্বিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি শীয়া হাদীসেও জারিয়া দাসী গ্রহণের দরুন তাঁর প্রতি হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ওই (শীয়া) হাদীসটি শীয়া মতবাদের একজন পূর্বসূরীর বর্ণিত; যাঁর নাম ইবনে বাবাভীহ আল-ক্বুম্মী। এটা একটা প্রসিদ্ধ শীয়া ওয়েবসাইটে বিদ্যমান। এয়া-যাহরা-ডট-ওর্গ বিবৃত করে:

মাজলিসী ‘বিহারুল আনওয়ার’ ৪৩/১৪৭

عن أبي ذر رحمة الله عليه قال : كنت أنا وجعفر بن أبي طالب مهاجرين إلى بلاد الحبشة فاهديت لجعفر جارية قيمتها أربعة آلاف درهم ، فلما قدمنا المدينة أهداها لعلي عليه السلام تخدمه ، فجعلها علي في منزل فاطمة .

فدخلت فاطمة عليها السلام يوما فنظرت إلى رأس علي عليه السلام في حجر الجارية فقالت : يا أبا الحسن فعلتها ، فقال : لا والله يا بنت محمد ما فعلت شيئا فما الذي تريدين ؟ قالت تأذن لي في المصير إلى منزل أبي رسول الله صلى الله عليه واله فقال لها : قد أذنت لك .

فتجللت بجلالها ، وتبرقعت ببرقعها

অনুবাদ: হযরত আবূ যর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন আল-মাজলিসী; তাঁর থেকে আল-ক্বুম্মী। হযরত আবূ যর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি হযরত জা’ফর তাইয়্যার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর সাথে হাবশী দেশে (মানে আবিসিনিয়ায়) হিজরত করি। চার হাজার (৪০০০) দিরহাম মূল্যের এক জারিয়া দাসীকে হযরত জা’ফর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর প্রতি উপহারস্বরূপ দেয়া হয়। আমরা যখন মদীনায় আগমন করি, তখন তাকে (দাসীকে) হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র কাছে উপহারস্বরূপ প্রদান করি, যাতে সে তাঁর খেদমত করতে পারে। হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) তাকে হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র ঘরেই রাখেন। একদিন হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) ঘরে প্রবেশ করে দেখেন হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র শির মোবারক ওই জারিয়া দাসীর কোলে। তিনি জিজ্ঞেস করেন: “হে (ইমাম) হাসানের বাবা! তুমি কি তার সাথে (সহবাস) করেছো?” ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) উত্তর দেন: “হে নবী নন্দিনী! আমি কিছুই করিনি; এমতাবস্থায় তুমি কী চাও?” হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: “তুমি কি আমায় আমার বাবার বাড়ি যাবার অনুমতি দেবে?” তিনি উত্তর দেন: “আমি অনুমতি দেবো।” অতঃপর হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) নিজের জিলবাব পরে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র কাছে যান।

চতুর্থতঃ - যা এ বিতর্কের অবসান ঘটাবে চূড়ান্তভাবে - তা হলো এই বাস্তবতা যে, এ ঘটনাটি শীয়া ধর্মীয় মতবাদের উৎসগুলোতেও উল্লেখিত হয়েছে। চিরায়ত শীয়া ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ শায়খ মুফীদ লেখেন:

(ইতিপূর্বে) আমীরুল মো’মেনীন (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বন্দীদের মধ্য হতে একজন জারিয়া দাসীকে পছন্দ করেন। এমতাবস্থায় হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’কে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র কাছে প্রেরণ করেন। তিনি (হযরত খালেদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: “রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর কাছে যাও সেনাবাহিনী সেখানে পৌঁছুবার আগেই। হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) খুমস্ (গনীমতের রাষ্ট্রীয় অংশ) হতে নিজের জন্যে জারিয়া দাসী বেছে নিয়ে যে আত্মসম্মানের হানি করেছেন, সে সম্পর্কে তাঁকে জানাও..।”

হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র সামনে হাজির হন। তাঁর সাথে ছিলো হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর একটি চিঠি যা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছিলো। তিনি হুজূরের (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কাছে তা পড়া আরম্ভ করেন। প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র চেহারা মোবারকে পরিবর্তন দেখা দেয়।

হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)! আপনি যদি মানুষকে এভাবে (করার) অনুমতি দেন, তাহলে তাদের গনীমত অদৃশ্য হয়ে যাবে।”

প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বলেন, “হে বোরায়দা, তোমার জন্যে আফসোস। তুমি তো কপটতা সংঘটন করেছো। আমি যে গনীমতের অংশের হক্কদার, তা হতে আলী ইবনে আবী তালেব-ও অংশ পাওয়ার হক্কদার। বোরায়দা, আমি তোমাকে সতর্ক করছি এ মর্মে যে তুমি আলীর প্রতি বৈরীভাব পোষণ করলে আল্লাহও তোমাকে অপছন্দ করবেন।”

হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন: ওই সময় আমার ইচ্ছে হয় যেনো জমিন দু ভাগে বিভক্ত হয়ে যাক এবং আমি ওর অভ্যন্তরে গ্রাস হয়ে যাই। অতঃপর আমি বলি, “আমি আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর রুদ্ররোষ হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। এয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), আমায় ক্ষমা করুন। আমি আর কখনোই হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহূ)’র প্রতি শত্রুতাভাব পোষণ করবো না এবং তাঁর সম্পর্কে শুধু ভালো বলবো।” প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ক্ষমা করে দেন।

حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا رَوْحُ بْنُ عُبَادَةَ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ سُوَيْدِ بْنِ مَنْجُوفٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلِيًّا إِلَى خَالِدٍ لِيَقْبِضَ الْخُمُسَ وَكُنْتُ أُبْغِضُ عَلِيًّا، وَقَدِ اغْتَسَلَ، فَقُلْتُ لِخَالِدٍ أَلاَ تَرَى إِلَى هَذَا فَلَمَّا قَدِمْنَا عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ ‏"‏ يَا بُرَيْدَةُ أَتُبْغِضُ عَلِيًّا ‏"‏‏.‏ فَقُلْتُ نَعَمْ‏.‏ قَالَ ‏"‏ لاَ تُبْغِضْهُ فَإِنَّ لَهُ فِي الْخُمُسِ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ ‏"‏‏.

অর্থ: প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’কে (গনীমতের) খুমুস্ (তথা রাষ্ট্রীয় অংশ) আনতে হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র কাছে প্রেরণ করেন, আর আমি তাঁর প্রতি বৈরিতা রাখতাম। (ওই সময়) তিনি গোসল করেছিলেন (খুমুস হতে গৃহীত জারিয়া দাসীর সাথে সহবাস করার পর)। আমি হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’কে বলি: ‘আপনি কি এটা (মানে হযরত আলী কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহুর কাজটি) দেখতে পাচ্ছেন না?’ আমরা যখন হুজূর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর সামনে হাজির হই, তখন বিষয়টি তাঁর কাছে পেশ করি। তিনি উত্তরে বলেন, “হে বোরায়দা, তুমি কি আলীর প্রতি শত্রুতাভাব পোষণ করো?” আমি উত্তরে বলি: ‘জি।’ তিনি বলেন: “বৈরিতা রেখো না, কেননা সে খুমস্ হতে অধিকতর পাওয়ার হক্কদার।

এটাই হলো সহিহাইনে (বুখারী ও মুসলিম হাদীসগ্রন্থ দুটোয়) বর্ণিত গাদীরে খুমের হাদীস। এতে ‘মওলা’ শব্দটির কোনো উল্লেখ-ই নেই। ইবনে তাইমিয়া বলেন: “مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ - ‘আমি যার মওলা, আলীও তার মওলা’ মর্মে নবী পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর বাণীটি সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে নেই। কিন্তু এটা সেসব বিবরণের একটা, যেটা এমন আলেম-উলেমার দ্বারা বর্ণিত হয়েছে যাঁদের নির্ভরযোগ্যতা/বিশ্বস্ততা সম্পর্কে মানুষেরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন।”

অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শীয়া গোষ্ঠী খামোখা হৈচৈ সৃষ্টি করেছেন। গাদীরে খুমের হাদীসটি খলীফা মনোনীত করা হতে একদম পৃথক একটি বিষয়। শীয়া আলেম এস,এইচ,এম, জাফরী লেখেন:

প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক গাদীরে খুমে প্রদত্ত ভাষণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ব্যাখ্যা সুন্নীবৃন্দ এভাবে দেন যে, কিছু মানুষ হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র বিরুদ্ধে গজগজ করছিলেন তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন অভিযানে প্রাপ্ত গনীমতের মালামাল বণ্টনে তাঁরই কঠোরতার ব্যাপারে; ওই অভিযানশেষে তিনি এবং তাঁর অধীনস্থ সহযোদ্ধাবৃন্দ সরাসরি মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র সাথে একত্রে হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁরই মেয়ের জামাইয়ের প্রতি পোষণকৃত হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার জন্যে এভাবে ভাষণ দান করেন (গাদীরে খুমে)।

তথ্যসূত্র

[: ইবনে বাবাভীহ আল-ক্বুম্মী প্রণীত ‘এলাল আল-শারাএ’, ১৬৩ পৃষ্ঠা; আরো বর্ণিত হয়েছে ‘বিহার আল-আনওয়ার’, ৪৩-৪৪ পৃষ্ঠা, ‘আলী (ক:)’র সাথে তাঁর জীবন কেমন ছিলো’ অধ্যায়; http://www.yazahra.net/ara/html/4/behar43/al5.html

বঙ্গানুবাদকের নোট: শীয়া ওয়েবসাইট-টি যথারীতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই লেখায় প্রদত্ত কোনো রেফারেন্স যাতে না পাওয়া যায় সে উদ্দেশ্যেই হবে]

[The Origins and Early Development of Shi'a Islam, এস,এইচ,এম, জাফরী, ২১ পৃষ্ঠা; লিঙ্ক: https://samensterk.files.wordpress.com/2010/11/shm-jafri-the-origins-early-development-of-shiaa-islam.pdf]     

[শায়খ মুফীদ প্রণীত ‘কিতা’ব আল-ইরশা’দ’, ১১১-১১২ পৃষ্ঠা; লিঙ্ক: https://www.shia-maktab.info/index.php/en/library/books/english?format=raw&task=download&fid=93]

হাদীসে গাদীরে খুম বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারী পুস্তকে (৫ম খণ্ড, বই নং ৫৯, হাদীস নং ৬৩৭):