‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন’-পক্ষে ভাড়াটিয়ার, তবুও দাপট বাড়িওয়ালার
ব্যস্ত নগরী ঢাকা। জিবীকার তাগিদে প্রতিদিন সারাদেশ থেকে ঢাকায় আসছে মানুষ। দিন দিন বেড়েই চলছে জনস্রোত। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকেরই প্রয়োজন আবাস স্থল। ফলে দিন দিন বেড়েই চলছে আবাসস্থলের চাহিদা

ব্যস্ত নগরী ঢাকা। জিবীকার তাগিদে প্রতিদিন সারাদেশ থেকে ঢাকায় আসছে মানুষ। দিন দিন বেড়েই চলছে জনস্রোত। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকেরই প্রয়োজন আবাস স্থল। ফলে দিন দিন বেড়েই চলছে আবাসস্থলের চাহিদা। প্রয়োজন অনুপাতে রাজধানীতে বাসস্থানের সংখ্যা অনেক কম। তাই চাহিদা অনেক।
 
এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অধিকাংশ বাড়িওয়ালা। অসহায় নিরুপায় ভাড়াটিয়াদের কী আর করার আছে। উপায়ন্তর না দেখে সবকিছু মেনে থাকতে হচ্ছে তাদের। বাড়িওয়ালারা প্রতিবছর বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করছেন নিজের ইচ্ছে মতোকরে। কোন কোন ভাড়াটিয়া এর প্রতিবাদ করলে কোন কোন বাড়িওয়াল তার সাথে খারাপ আচরন করছেন আবার কাউকে বাড়ি থেকে জোর পূর্বক বেরও করে দিচ্ছেন।

এ ক্ষেত্রে মানছেননা কোন নিয়ম কানুন। ২৫ এপ্রিল-২০১০ হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ রিট আবেদন করে প্রতিবছর বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধি বিধান কার্যকর করতে সরকারের প্রতি হাইকোর্ট রুল জারি করেছিল মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ । উক্ত রিট আবেদনে বলা হয়, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে ভাড়ার রশিদ, বাড়ি ছাড়ার নোটিশসহ বিভিন্ন বিধান রয়েছে। কিন্তু অনেক বাড়িওয়ালা আইন ভেঙে ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ান, যখন-তখন বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেন, ভাড়াটের বাড়ি ভাড়ার রশিদ দেন না।

বস্তুত বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের মধ্যে যথেষ্ট তিক্ত সম্পর্ক সব সময় থাকে। এটার প্রধানতম কারণ হলো বাড়িওয়ালাদের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা। বাড়ি ভাড়া নিয়ে একটা আইন আছে। কিন্তু এই আইনের বাস্তবিক কোন প্রয়োগ নেই। তাই সুযোগটা নিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা। ভাড়াটের পক্ষ থেকে তাদের উপর চালিত ভাড়া নির্যাতন অবসানে সরকারের প্রতি কতবার আবেদন জানিয়েছে কোন কাজ হয়নি। অবসান হয়নি বাড়িওয়ালাদের নির্যাতন। এমনকি  হাইকোর্টে রিট আবেদনের পরেও  কোন সুরাহা হয়নি। উল্টো দিন দিন বেড়েই চলছে বাড়ি ভাড়া।

অনেক বাড়িওয়ালা আছেন, চুক্তিপত্রের মাধ্যমে কোনো কিছু সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াকে অহেতুক ঝামেলাপূর্ণ মনে করেন। ফলে তারা এই বিষয়টিকে এড়িয়ে চলেন। ভাড়াটিয়াও একটি সুন্দর বাড়িতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার লোভে চুক্তিপত্র সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে উৎসাহী হন না। এর ফলে কোনো ঝুটঝামেলা দেখা দিলে তা নিয়ে অহেতুক হয়রানির শিকার হন।

এসব সমস্যা সমাধানের জন্য যে কেউ বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর আওতায় রেন্ট কোটের্র আশ্রয় নিতে পারেন। এ আইনের ৭ ধারা মতে, কোনো বাড়ি ভাড়া মানসম্মত ভাড়ার অধিক বৃদ্ধি করা হলে ওই অধিক ভাড়া কোনোভাবেই আদায়যোগ্য হবে না। এ ক্ষেত্রে মানসম্মত ভাড়া বলতে উপযুক্ত ভাড়াকেই বোঝানো হয়েছে।

এ ভাড়া বাড়ির মালিক ও ভাড়টিয়ার মধ্যে আপসে নির্ধারিত হতে পারে। আবার ঘর ভাড়া নিয়ন্ত্রকও এ ভাড়া নির্ধারণ করতে পারেন। ভাড়াটিয়া কর্তৃক ভাড়া পরিশোধ করা হলে বাড়ির মালিক তৎক্ষণাৎ ভাড়া প্রাপ্তির একটি রসিদ বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে ভাড়াটিয়াকে প্রদান করবেন। বাড়ির মালিক ভাড়ার রসিদের একটি চেকমুড়ি সংরক্ষণ করবেন। বিনা রসিদে কোনো ভাড়া প্রদান করে থাকলে ভাড়াটিয়া কোনো মজুরা পাবে না। অগ্রিম ভাড়া হিসেবে এক মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা দাবি বা গ্রহণ করতে পারবেন না। মানসম্মত ভাড়া অপেক্ষা অধিক হারে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়ে থাকলে এবং এই মর্মে কোনো চুক্তি থাকলেও তা কার্যকর হবে না। অর্থাৎ মানসম্মত ভাড়া অপেক্ষা অধিক হারে ভাড়া কোনো অবস্থাতেই আদায় করা যাবে না।

তবে ভাড়া দেয়ার পর বাড়ির মালিক নিজ খরচে বাড়িটির কিছু উন্নয়ন সাধন করলে কিংবা আসবাবপত্র সরবরাহ করলে যা বাড়ি উন্নয়ন বলা যাবে। সে ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া একমত হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া ধার্য করতে পারবেন। বাড়ির মালিক যদি কোনো কারণে কিংবা ভাড়াটিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে ভাড়ার টাকা নিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ভাড়াটিয়া ডাকযোগে মানি অর্ডার করে ভাড়ার টাকা পাঠানোর পর বাড়ির মালিক যদি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, তখন ডাক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফেরত পাওয়ার এক পক্ষকালের (১৫ দিন) মধ্যে ভাড়াটিয়া ওই টাকা ভাড়া নিয়ন্ত্রকের (আদালত) কাছে জমা দিতে পারবেন। এই শর্ত পূরণ হলে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না। শর্ত পূরণ না হলে ভাড়াটিয়া খেলাপকারী বলে গণ্য হবেন এবং উচ্ছেদ থেকে রক্ষা পাবেন না।

ভাড়াটিয়াকে বাড়ির মালিক ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো অনুপযোগী বা বসবাসের অযোগ্য অবস্থায় রাখতে পারবেন না। আশঙ্কামুক্ত অবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাসের জন্য বাড়িটি যে অবস্থায় প্রস্তুত রাখা উচিত, তা বাড়ির মালিক করতে বাধ্য। নতুবা ভাড়াটিয়া বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদন করতে পারেন। শুনানিক্রমে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রক বাড়ির মালিককে নির্দেশ দেবেন। বাড়ির মালিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে ব্যর্থ হলে ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রককে জ্ঞাত করে তিনি নিজে মেরামত করে নিতে পারবেন। তবে খরচ এক বছরের মোট ভাড়ার ছয় ভাগের এক ভাগের বেশি হবে না।

ভাড়া দেয়া বা ভাড়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করার কারণে কোনো ব্যক্তি ভাড়ার অতিরিক্তি প্রিমিয়াম, সালামি, জামানত বা অনুরূপ কোনো অর্থ দাবি বা গ্রহণ করার লক্ষ্যে ভাড়াটিয়াকে প্রদানের জন্য বলতে পারবেন না (ধারা ১০)। ১২ ধারানুযায়ী কোনো ব্যক্তি কোনো বাড়ির আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য শর্ত রাখতে পারবেন না। ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াকে ভাড়া গ্রহণের লিখিত রসিদ প্রদানে বাধ্য থাকবেন। এ রসিদ বিধি দ্বারা নির্বাচিত ফরমে স্বাক্ষর করে ভাড়াটিয়াকে প্রদান করতে হবে। বাড়ির মালিক ভাড়ার রসিদের একটি চেকমুড়ি সংরক্ষণ করবেন। এ রসিদ সম্পন্ন করার দায়-দায়িত্ব বাড়িওয়ালার। রসিদ প্রদানে ব্যর্থ হলে ২৭ ধারানুযায়ী ভাড়াটিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

এ আইনে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার নির্দিষ্ট এলাকার জন্য কোনো ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে। এ নিয়ন্ত্রক কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে দরখাস্তের শুনানি করতে পারবেন। প্রয়োজনে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার প্রতি নোটিশ জারি করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে কোনো বাড়িতে প্রবেশ ও পরিদর্শনের ক্ষমতা থাকবে নিয়ন্ত্রকের। ১৫ ধারামতে, নিয়ন্ত্রক বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়ার আবেদনের ভিত্তিতে বাড়ি ভাড়া এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন, যেন এর বার্ষিক পরিমাণ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে  ওই বাড়ির বাজার মূল্যের ১৫ শতাংশের সমান হয়।

এমতাবস্থায় অনুরূপভবে নির্ধারিত মানসম্মত ভাড়া, নিয়ন্ত্রক কর্তৃক সংশোধন বা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত এ ধারার অধীন নির্ধারিত মানসম্মত ভাড়া, নিয়ন্ত্রক কর্তৃক সংশোধন বা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত এ ধারার অধীন নির্ধারিত মানসম্মত ভাড়া হিসেবে গণ্য হবে। বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়ার দরখাস্তের ভিত্তিতে দুই বছর পর পর নিয়ন্ত্রক মানসম্মত ভাড়া পুনর্নিধারণ করতে পারবেন।

ভাড়াটিয়াকে ইচ্ছে মতো বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যায় না। চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করে থাকলে ভাড়াটিয়াকে হঠাৎ করেই উচ্ছেদ করা যায় না। চুক্তিপত্রের অবর্তমানে যদি কোনো ভাড়াটিয়া প্রতি মাসের ভাড়া পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করেন অথবা ঘর ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা করতে থাকেন, তাহলে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না।

বছরের পর বছর ধরে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির ফলে ভাড়াটিয়াদের দুর্গতির শেষ নেই। কিছু দিন আগে রাজধানী ঢাকায় ভাড়া বৃদ্ধির একটা জরিপ চালানো হয়েছিল। জরিপে জানা যায় রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের উপার্জনের ৬০ ভাগ ব্যয় হয় বাড়ি ভাড়া প্রদানে। বাকি ৪০ ভাগ দিয়ে কোন রকমে দিন গুজরান করেন।

অন্য এক জরিপ থেকে জানা যায়, ২৭ ভাগ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, ৫৭ ভাগ ভাড়াটিয়া প্রায় অর্ধেক, ১২ ভাগ আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করেন। ৪ ভাগ ভাড়াটিয়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

জরিপে আরো জানা যায়, ভাড়াটিয়াদের ৫৫ ভাগ বাসার আয়তন সম্পর্কে জানেন না। তবে শত ভাগ ভাড়াটিয়া মনে করেন বাড়িভাড়ার ব্যাপারে সরকারের সক্রিয় হওয়া উচিত।

ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে ৮৫ ভাগ মানুষ ভাড়া বাড়িতে থাকেন। ৫ ভাগ মানুষ বসবাস করে নিজ বাড়িতে এরা কাউকে ভাড়া দেয় না। কারো কাছ থেকে ভাড়াও পাচ্ছে না। আর বাকি ১০ ভাগ মানুষ ৮৫ ভাগ মানুষের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে। আর এই দশ ভাগ মানুষের কাছে মহানগরীর ৮৫ ভাগ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকে। সরকার ৮৫ ভাগ মানুষের জন্য এ পর্যন্ত কার্যকর কিছু করতে পারেন নি।

বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির যুক্তি হিসাবে বাড়ির মালিকরা সরকারি ও সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স বাড়ানোর উদাহরণ দেন। কিন’ যে ট্যাক্স দিতে হয় তা খুবই সামান্য। এবং গত দুই দশক ধরে বাড়ানোও হয়নি। এমনকি বাড়ি ভাড়া আয় থেকে মালিকদের যে ট্যাক্স সরকারকে দিতে হয় তাও সরকার আদায় করেনি এমন রিপোর্ট গনমাধ্যমে বহুবার এসেছে। এক গবেষণায় জানা যায়, গত ১৪ বছরে ঢাকায় বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৫০ গুণ।  

অঞ্চলভেদে ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া কেমন হবে তা নির্ধারন করে সিটি করপোরেশন একটি তালিকা ও প্রকাশ করেছ্ ে। কিন্তু সে তালিকা মানছেনা কেউ। আর তা বাস্তবায়নের ও কোন উদ্যোগ নেই সিটি করপোরেশনের। প্রশাসনের অবহেলা আর বাড়িওয়ালাদের অতি চাপে ভাড়াটিয়ারা আয়ের সিংহভাগ টাকাই খরচ করে ফেলছেন বাড়ি ভাভাড়ায়।

ইদানিং শোনা যাচ্ছে সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে কে কতটাকা হারে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে তা খতিয়ে দেকা যাবে। এছাড়াও বাড়িওয়ালাদেরকে আয়করের আওতায় নিয়ে আসা যাবে। মোট কথা বাড়ি ভাড়া কমাতে সরকারকেই আন্তরিক হতে হবে এবং সেই সাথে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালা উভয়কে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে বাড়িওয়ালার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
    
                                                                                                                                               ---আমানুল্লাহ নোমান