কিছু বিখ্যাত উপন্যাসের নাম

তিন সপ্তাহের দীর্ঘ লকডাউন। উপায়ও নেই। বাইরে ওত পেতে বসে আছে অজানা অচেনা শত্রু করোনা, যাকে কেউ চেনে না। অতঃপর আপাতত গৃহবন্দী। দীর্ঘ এই সময়ে আসুন হাতে তুলে নিই বই, হঠাৎ প্রাপ্ত অবসরে ডুব দিই বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা অমৃত সাগরে। উপন্যাস বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, সামাজিক উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ইত্যাদি। প্রত্যেকটি শ্রেণীর উপন্যাসেই দেখা যায় নানা প্রেম কাহিনি, বাংলা সাহিত্যের বিবিধ প্রেমের উপন্যাসের মধ্যে সেরা কুড়িটি উপন্যাস বলতে গেলে প্রথমেই যে উপন্যাস গুলির কথা মনে আসে সেগুলি হল-   

#  কিছু বিখ্যাত বাংলা উপন্যাসের নাম ঃ

১. শেষের কবিতা ঃ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ ১৯২৯  সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাসটি, ভালাবাসা কিন্তু স্ব ইচ্ছায় বিচ্ছেদের কাহিনী শেষের কবিতা। শেষের পরেও যেমন কিছু কবিতা আমাদের অন্তরকে ভাবায় তেমনই দুটি চরিত্র হলো অমিত এবং লাবণ্য। জনপ্রিয় এই উপন্যাসে কবিতাগুলির ভাষাগত শৈলী অপূর্ব। অমিত লাবণ্যের প্রেম ধরা দিয়েও ধরা দেয়নি। উপন্যাসিকের আধুনিকতা, সৌন্দর্য চেতনার বহিঃপ্রকাশ উপন্যাসটির ছত্রে ছত্রে বিরাজমান।

২.পুতুল নাচের ইতিকথা ঃ

পুতুল নাচের ইতিকথা বাঙালি সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিখ্যাত উপন্যাস। প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রামের ডাক্তার শশী। ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস নেই। গ্রামের পটভূমিতে শশী, শশীর বাবা, কুসুম-সহ অন্যান্য চরিত্রগুলোর মাঝে বিদ্যমান জটিল সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গড়ে উঠেছে এর কাহিনি ও প্রেক্ষাপট (পুতুল নাচের ইতিকথা)। ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রেম, বিরহ, দ্বেষ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা কে উপজীব্য করে লেখা এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

৩. প্রথম আলো ঃ

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি এই সত্যাশ্রয়ী উপন্যাসটি দুই খন্ডে বিভক্ত। ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতকের প্রথমদিকের কলকাতা তথা ভারতবর্ষের বিখ্যাত কিছু ঐতিহাসিক চরিত্র হেঁটে চলে বেড়ান এই উপন্যাসের পাতায় পাতায়। রবীন্দ্রনাথ থেকে লর্ড কার্জন, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে মহাত্মা গান্ধী, সুনীলের অনবদ্য লেখনী শৈলীর গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রতিটি চরিত্র। আমার আপনার মত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য রয়েছে ভরত বা দ্বারিকানাথ বা ভূমিসুতার মত সাধারণ মানুষেরাও। উপন্যাসটি যাতে ইতিহাসের ভারে নুয়ে না পড়ে, সাহিত্যগুন যাতে ষোল আনা বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করেছে সুনীলের অনবদ্য লেখনী। বাঙালির নবজাগরণের উপর রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবেই পরিগণিত এই উপন্যাস। সুনীল নিজেই উপন্যাসটির ভূমিকায় স্বীকার করেছেন যে, এই উপন্যাসটির তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁকে লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে পর্যন্ত হানা দিতে হয়েছিল। তৎকালীন বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ, তাঁদের কার্যকলাপ, ইংরেজ শাসকদের মনোভাব, রবীন্দ্রনাথ সহ ঠাকুর পরিবারের বিবিধ সামাজিক, ধর্মীয় এবং অবশ্যই সাহিত্যিক কার্যকলাপ, গিরিশচন্দ্র ঘোষের অনবদ্য প্রতিভার ফলস্বরূপ বাংলা নাটকের উত্থান ও স্টার থিয়েটারের আদিযুগ, স্বামী বিবেকানন্দ ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কার্যাবলী ও বেলুড় মঠের প্রতিষ্ঠা, ভগিনী নিবেদিতা ও বিবেকানন্দের যৌথ সামাজিক আন্দোলন ও পরবর্তীকালে বেলুড়ের সাথে বিচ্ছেদ, বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপট, তরুণ মহাত্মা গান্ধী – সুনীলের অনবদ্য লেখনী ছুঁয়ে গেছে প্রতিটি কোণ। নিজেদের শিকড়ের খোঁজ করলে পড়তেই হবে এই ক্লাসিক। 

৪. দেবদাস ঃ

দেবদাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি প্রণয়ধর্মী বাংলা উপন্যাস। দেবদাস শরৎচন্দ্রের প্রথম দিকের উপন্যাস। রচনার সমাপ্তিকাল সেপ্টেম্বর ১৯০০। কিন্তু প্রকাশনার বছর ১৯১৭।

উপন্যাসে দেবদাস বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তৎকালীন ব্রাহ্মন জমিদার বংশের সন্তান, পার্বতী এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে৷ বাংলার তালসোনাপুর গ্ৰামে এই দুই পরিবারের পাশাপাশি বাস। ছোটবেলা থেকেই দেবদাস ও পার্বতীর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব যা পরবর্তীতে প্রেমের রূপ নেয়। কৈশোরে উত্তীর্ণ দুজন হঠাৎই অনুভব করে, তাদের বাল্যকালের বন্ধুত্ত্ব আর‌ও গভীর কিছুতে উত্তীর্ণ হয়েছে। দেবদাস দেখে যে তার ছোটবেলার পারো বদলে গেছে। পার্বতী তাদের কৈশোরের প্রেম বিবাহবন্ধনে পরিস্ফুটনের কথা ভাবে। প্রচলিত সামাজিক রীতি অনুযায়ী, পার্বতীর বাবা-মাকে দেবদাসের বাবা-মায়ের কাছে তাদের বিবাহের প্রস্তাব আনতে হবে। পার্বতীর মা দেবদাসের মা হরিমতির কাছে বিয়ের প্রস্তাব আনলে তিনি আনন্দিত হলেও পাশের বাড়ির সাথে এই সম্পর্ক রাখতে তিনি বিশেষ উৎসাহী হন না। এতে পার্বতীর পিতা নীলকন্ঠ চক্রবর্তী অপমানিত বোধ করেন ও পার্বতীর জন্য আরও ধনী গৃহে বিয়ে ঠিক করেন। পার্বতী একথা জানলে দেবদাস অন্তত তাকে গ্ৰহণ করবে এই আশায় রাতের অন্ধকারে তার সাথে দেখা করে। দেবদাস মনস্থির করে তার বাবাকে বললে, তিনি অরাজি হন (Best Bengali Novels)। বিভ্রান্ত অবস্থায়, দেবদাস বাড়ি থেকে কলকাতায় পালিয়ে যায়। সে চিঠি লিখে পার্বতীকে জানায় যে সে এই সম্পর্ক আর রাখতে চায় না। 

দেবদাস কলকাতায় ফিরে যায় ও পার্বতীর হাতিপোতা গ্ৰামে ভুবন চৌধুরী নামে এক জমিদারের সাথে বিয়ে হয়। ভুবন চৌধুরীর পূর্বের স্ত্রী মারা গেছেন ও তার তিনজন সন্তান রয়েছে, যারা পার্বতীর প্রায় সমবয়সী বা তার চেয়ে বড়ো। কলকাতায় গিয়ে দেবদাসের চুনীলালের সাথে বন্ধুত্ব হয় ও তার মাধ্যমে সে চন্দ্রমুখী নামে এক বাঈজীর সাথে পরিচিত হয়। সে দেবদাসের প্রেমে পড়ে, যদিও দেবদাস তাকে ঘৃণা করতে থাকে। হতাশাগ্ৰস্ত দেবদাস অত্যধিক মদ্যপান শুরু করলে তার শরীর ক্রমশ ভে‌‌ঙে পড়ে। চন্দ্রমুখী তার দেখভাল করতে থাকে। দেবদাস তার মনে প্রতিনিয়ত পার্বতী ও চন্দ্রমুখীর তুলনা করতে থাকে ও চন্দ্রমুখীকে সে পারোর কথা বলে। দুঃখ ভুলতে দেবদাস ক্রমশ মদ্যপানের মাত্রা বাড়াতে থাকে ও তাতে তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। চন্দ্রমুখী বুঝতে পারে যে দেবদাসের ভিতরের আসল মানুষটির আজ পতন ঘটেছে (Bengali Novels)। দেবদাস শেষপর্যন্ত চন্দ্রমুখীর প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়। শীঘ্র আসন্ন মৃত্যুর কথা অনুভব করতে পেরে দেবদাস, পারোকে দেওয়া তার পূর্বের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করতে হাতিপোতা গ্ৰামে পার্বতীর কাছে র‌ওনা হয়। পার্বতীর বাড়ির সামনে পৌঁছে, এক অন্ধকার শীতের রাতে দেবদাসের মৃত্যু হয়। 

৫. তুঙ্গভদ্রার তীরে ঃ

তুঙ্গভদ্রার তীরে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রকাশের পর এটি রবীন্দ্র পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিল। রাজা দেবরায় উপন্যাসের একটি মুখ্য চরিত্র (Bangla Novel) হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়। বরং উপন্যাসটি (তুঙ্গভদ্রার তীরে) দুই নারী বিদ্যুন্মালা এবং মনিকঙ্কনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।

৬. পথের পাঁচালি এবং অপরাজিত ঃ

আবেগী বাঙালির খুব কাছের এই উপন্যাসদ্বয়। একত্রে এই দুই উপন্যাসকে উল্লেখ করার কারণ, একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত, একটিকে ছাড়া অপরটির অস্তিত্ব ভাবা যায় না। অমর ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিরকালীন সৃষ্টি অপু এবং তার কাহিনী। শিশু অপু, তার বড় হয়ে ওঠা, দারিদ্র্যের সাথে মরিয়া লড়াই, সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করা এবং কালক্রমে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিতিলাভ, অপুর জীবনের এই পুরো জার্নির সঙ্গী নিজের অজান্তেই যেন হয়ে যাই আমরা। টুকরো টুকরো ঘটনা অঙ্কনে বিভূতিভূষণ সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে অন্যতম সেরার স্থান অধিকার করবেন। গল্প বলার এমন অনবদ্য নিদর্শন খুব কমই দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যে কিছু অমর দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে এই দুই উপন্যাস। বালক অপু ও তার দিদির আম কুড়ানোর দৃশ্য, তাদের একত্রে ট্রেন দেখার ঘটনা পাঠক হাজার চেষ্টা করেও ভুলতে পারবেন না। ঠিক তেমনই দিদি দুর্গার মৃত্যু, নিশ্চিন্দিপুর ত্যাগ করার সময় মৃতা দিদির জন্য অপুর বুক ফাটা অনুভূতির কাহিনী পড়তে পড়তে চোখ আর্দ্র হয়নি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পরবর্তীকালে টিকে থাকার দাঁতে দাঁত চাপা লড়াই, অপুর স্ত্রী অপর্ণার অকালমৃত্যু, পুত্র কাজলের মধ্যে অপুর নিজের শৈশবকে খুঁজে পাওয়া – প্রত্যেকটা ঘটনাই যেন পাঠককে সম্পৃক্ত করে দেয় চরিত্রগুলির সাথে। বাংলা সাহিত্যের রূপ রস গন্ধের খোঁজ পেতে চাইলে ঝটপট পড়ে ফেলুন এই দুই উপন্যাস। 

৭. আরণ্যক ঃ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসটি সম্পর্কে বলা হয় যে, সম্পূর্ণ বিশ্ব সাহিত্যে এই উপন্যাসটি অনন্য। সেই অর্থে এই উপন্যাসে কোনও নায়ক নেই, প্রকৃতি স্বয়ং এখানে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এক শহুরে যুবকের একরাশ বিরক্তি সহ কর্মসূত্রে জঙ্গলমহলে আগমন, এবং কালক্রমে প্রকৃতির প্রেমে কর্মক্ষেত্র কেই আপন করে নেওয়ার অসাধারন কাহিনী একটি অবশ্যপাঠ্য। বিভূতিভূষণের নিজস্ব অভিজ্ঞতার অসামান্য প্রভাব আছে এই উপন্যাসে। অরণ্য ও তার সন্তানদের কাহিনীই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সাহচর্যের এমন জীবন্ত দলিল আর দেখা যায় না। রাজু পাঁড়ে, সত্যচরণ, মটুকনাথ, দোবরু পান্নার মত চরিত্রগুলি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ঘটনা বর্ণনা করতে বিভূতিভূষণের জুড়ি নেই। এই উপন্যাসেও একাধিক ঘটনা পাঠকের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ পূর্ণিমার রাতের চন্দ্রালোকে ভেসে যাওয়া অরণ্য প্রান্তরের মধ্য দিয়ে অশ্বারোহণের বর্ণনাকে উল্লেখ করা যায়। প্রকৃতির সাথে রোম্যান্সের এই কাহিনী জানতে হলে ঝটপট পড়ে ফেলুন এই উপন্যাস।

৮. ঘুণপোকা ঃ

ঘুণপোকা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। গল্পটা অনেকটা এই রকম… সেইন্ট অ্যান্ড মিলারের চাকরিটা জুন মাসে ছেড়ে দিল শ্যাম। চাকরি ছাড়ার কারণটা তেমন গুরুতর কিছু ছিল না। তার ড্রইংয়ে একটা ভুল থাকায় উপরওয়ালা হরি মজুমদার জনান্তিকে বলেছিলেন, বাস্টার্ড। মজুমদার অনেক হাবভাব, কথাবার্তা নকল করে আসছিল (Bangla Novel)। মাঝে মাঝে বেয়ারা এবং দু’-একজন শিক্ষানবিশ ড্রাফটসম্যানকে সে মজুমদারের মার্কামারা গালাগালগুলো একই ভঙ্গিতে এবং সুরে উপহার দিয়েছে এবং এমনকী তার এ রকম (ঘুনপোকা) বিশ্বাস এসে যাচ্ছিল যে,পুরনো এইসব গালাগালগুলো বহু ব্যবহারে শক্তিহীন হয়ে গেছে, এগুলোর আর তেমন জোর তেজ নেই। আরও কিছু নতুন রকমের গালাগাল আবিষ্কৃত না হলে আর চলছে না। তবু মজুমদারের কথাটা কানে এলে দু’একদিন একটু ভাবল শ্যাম…। 

 ৯. পদ্মানদীর মাঝি ঃ

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভবত সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রায় সব ভারতীয় প্রধান আঞ্চলিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।  অন্য কোনও বাংলা সাহিত্যকর্ম এত বেশি ভাষায় অনূদিত হয় নি। উপন্যাসটির মধ্যে এক রোমান্টিক রহস্যময়তা আছে। পূর্ববঙ্গের প্রেক্ষাপটে রচিত এই কাহিনীতে শুধু যে পদ্মানদী কেন্দ্রিক মৎস্যজীবীদের কাহিনী বর্ণিত আছে তাই নয়, তাদের কাছে জীবনের কি অর্থ, তাই নিয়ে বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিতে এক অনবদ্য পরিবেশনা বলা যেতে পারে উপন্যাসটিকে। মূল চরিত্র কুবেরের একইসাথে পরিবারের প্রতি ভালবাসা ও কপিলার প্রতি এক আদিম আকর্ষণ মনস্তত্ত্বের জটিলতাকে হাজির করেছে। হোসেন মিয়ার নিষিদ্ধ দ্বীপ, যেখানে কুবের ও কপিলা খুঁজে পায় তাদের জীবনের সার্থকতা, যেন এক শ্রেণীহীন ও বন্ধনহীন সমাজের প্রতিচ্ছবি। মানিকের বামপন্থার তীব্রতম প্রকাশ এই সৃষ্টি, যেখানে পরকীয়া প্রেমের মধ্য দিয়ে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে শ্রেণীহীন সমাজে মুক্তির স্বাদ অর্জনের আখ্যান বর্ণিত। 

১০. মেঘ বলেছে যাব যাব ঃ

অনেকদিন আগে এই বইটি পড়েছিলাম। একদমই নিখাদ হুমায়ূনীয় ঢঙে লেখা, প্লটও মধ্যবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসান। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই তরুণের সাথে ভাব ভালবাসা আছে তিতলি নামক একজন তরুণীর।

কিন্তু, ভাগ্য কি তাদের এক সূত্রে মেলায় নাকি মধ্যবিত্ত টানাপোড়েনে বদলে যায় ভালবাসার গন্তব্য? উপন্যাসটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রীনা ভাবীর জীবনের দ্বন্দ্বও আপনাকে ভাবাবে নিশ্চিতভাবে। আমাদের নাগরিক জীবনের ভালবাসার হাহাকার কিংবা অভিলাস ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে৷ ভালবাসা দিবসে এই বইটি তাই যাদের পড়া আছে তারা আরেকবার পড়ে সেই ভালবাসার ভুবনে হারিয়ে যেতে পারেন, যাদের পড়া নেই, তারা সংগ্রহে রাখতে পারেন অদ্ভুত সুন্দর এই প্রেমের উপন্যাসটি।

১১. চাঁদের পাহাড় ঃ

বাঙালির অ্যাডভেঞ্চার রোমান্টিকতার শেষ কথা বিভূতিভূষণের এই অমর সৃষ্টি। বাঙালি যুবা মাত্রই তার পায়ের তলায় সর্ষে, আর শঙ্কর এই বাঙালি যুব সমাজের সার্থক প্রতিনিধি। পরাধীন ভারতে, যখন ভারতীয়দের পায়ে শৃঙ্খল, বিভূতিভূষণ তখন শঙ্করকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ দুর্গম কালাহারি মরুভূমি। ভারতের বাইরে কোনোদিন পা না রাখা বিভূতিভূষণের এই উপন্যাসে তথ্যগত বিভ্রান্তি আছে ঠিকই, কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের সুনিপুণ পরিবেশনা শঙ্করকে কখন যেন করে তোলে পাসের বাড়ির ছেলে, যার বিপদে আমরা শঙ্কিত হই আর যার সাফল্যে আমরা উদ্বেলিত হই। বুনিপ নামক কাল্পনিক জন্তুর বিরুদ্ধে শঙ্করের লড়াই তো বাংলা সাহিত্যের লোকগাথা তে পরিণত হয়েছে। দিয়েগো আলভারেজ নামক চরিত্রটিও এক অনবদ্য সৃষ্টি। অ্যাডভেঞ্চারের সাথে সাথে দেশ ভ্রমণের তৃপ্তিও পাঠককে দিয়েছেন ঔপন্যাসিক। দিয়েছেন অজানা অচেনা জায়গায় কর্মলাভের রোমাঞ্চকর অনুভূতি। বরাবরের বেস্টসেলার এই উপন্যাস বাঙালির হৃদয়ের অত্যন্ত কাছের। 

১২. কালবেলা ঃ

উপন্যাস একাদশের মধ্যে সাম্প্রতিকতম হল সমরেশ মজুমদারের এই বিখ্যাত রাজনৈতিক উপন্যাস। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা রাজনৈতিক উপন্যাসের মধ্যে সম্ভবত সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অনিমেষ মাধবীলতা খ্যাত এই উপন্যাস। সত্তরের উত্তাল সময়ে সদ্য কলকাতায় আগত ছাত্র অনিমেষের বাম ও পরবর্তীকালের অতিবাম ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং বিপ্লবের নেশায় মত্ত হয়ে সবশেষে করুন পরিণতির গল্প শোনায় এই উপন্যাস। কিন্তু, এই উপন্যাস হতাশার নয়, এই কাহিনী হেরেও জিতে যাওয়ার। সৌজন্যে মাধবীলতা। অনিমেষের এই প্রিয়তমা নারী রাজনীতিতে পটু নয়, সে শুধু জানে ভালোবাসতে তার প্রিয় অনিকে। অনির জন্যই তার পরিবার ত্যাগ, অনির জন্যই তার স্বেচ্ছায় দারিদ্র্য বরণ, পরিশেষে পঙ্গু অনির আশ্রয়দাতা ও সে ই। আদর্শ ভঙ্গের হতাশায় ডুবে যেতে যেতে অনিমেষ ভেসে ওঠে আবার, যখন সে বোঝে ” বিপ্লবের আরেক নাম মাধবীলতা “। হ্যাঁ, মাধবীলতার জীবন একটি বিপ্লব এবং সফল বিপ্লব। অশান্ত সেই দশককে দুই চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরে অসাধারন এক আখ্যানের জন্ম দিয়েছেন সমরেশ। রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে এটি অনন্য। 

১৩.তিথিডোর ঃ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটকে তিনি চোখের সামনে দেখেছেন। দেখেছেন মধ্যবিত্ত জীবন। নিজের ব্যক্তিগত জীবনটা কাটিয়েছেন একপ্রকার নিঃসঙ্গতায়। এই সব কিছুই কি এসেছে এই উপন্যাসে? হতে পারে। তিথিডোরকে অনেকেই বলেন বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এখানে প্রেম এসেছে, নিঃসঙ্গতা এসেছে। লেখকের ফ্যাসিবাদবিরোধী সত্ত্বাও ফুটে উঠেছে। কিন্তু উপন্যাস আবর্তিত হয়েছে সেইসময়কার মধ্যবিত্তজীবনের চালচিত্রকে কেন্দ্র করে।

সৌখিন রাজেনবাবুকে পাওয়া যায় উপন্যাসের শুরুতে। তার সর্বকনিষ্ঠ কন্যা সন্তান স্বাতী একসময় উপন্যাসের মূল কেন্দ্রে চলে আসে। স্বাতীর সাথে একধরণের সম্পর্ক গড়ে উঠে কলেজ শিক্ষক সত্যেন রায়ের। কিন্তু আজন্ম একটু মুখচোরা, অমিশুক স্বাতীর জীবনে চলে আসে আরেকজন মানুষ, তার দাদার বন্ধু প্রবীর মজুমদার। স্বাতী বিভ্রমে ভুগে। সম্পর্কের গন্তব্য তবে কোন স্টেশনে থামবে? দারুণ সহজিয়া, সাবলীলতায় বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসটি পড়লেই জানা যাবে বাকিটুকু!

১৪. শ্রীকান্ত ঃ

ম্যারাথন এই উপন্যাসটি অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেরা বলেই বিবেচিত। আত্মজীবনী মূলক এই উপন্যাসটি চার খন্ডে বিভক্ত এবং এটি শ্রীকান্ত নামে এক যুবকের, যে চরিত্রটি স্বয়ং ঔপন্যাসিকের ছায়া বলে পরিচিত, জীবন আখ্যান। বাংলা থেকে রেঙ্গুন, এক বিশাল ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে এই উপন্যাসের ব্যাপ্তি। সময়ে সময়ে শ্রীকান্তের জীবনে এসেছে ইন্দ্রনাথের মত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আবার, অভয়া অথবা রাজলক্ষ্মীর মত নারী চরিত্রের স্পর্শ পেয়েছে সে। শরৎচন্দ্র বরাবরই নারী চরিত্রের অনবদ্য বুননের জন্য বিখ্যাত, এই উপন্যাসে তা পূর্ণতা পায়। নারী পুরুষের সম্পর্কের অজস্র ঘাত প্রতিঘাত, জটিলতা সামনে এনে দিয়েছে এই উপন্যাস। প্রাক স্বাধীনতা যুগের আর্থ সামাজিক জীবন ভীষণভাবে উপস্থিত এই উপন্যাসে। শ্রীকান্তের সঙ্গী হয়ে একটি যুগের সাক্ষী হতে চাইলে পড়ে ফেলুন এই অমর সৃষ্টি। 

১৫. কবি ঃ

বাংলা সাহিত্য জগতে যে কজন লেখক বিশ্বমানের লেখা উপহার দিয়েছেন তার মধ্যে তারাশঙ্করের নাম বারবার প্রাসঙ্গিক। এই লেখকের অমর সৃষ্টি ‘কবি’। এই উপন্যাসের একটা লাইনে যেন আমাদের সবার জীবনেরই আক্ষেপ, বুক হু হু করে উঠা প্রেমের আকুল অনুভূতি ফুটে ওঠে – ‘ভালবেসে মিটলো না আশ, কুলাল না এ জীবনে।

হায়! জীবন এত ছোট ক্যানে,এ ভুবনে?’ ডোম বংশের নিতাই চরণ বাপ দাদার পেশা ডাকাতি ছেড়ে কবিয়াল জীবন বেছে নেয়৷ ভালবেসে ফেলে ঠাকুরঝিকে। কিন্তু সমাজ তো এই প্রেম মানবে না। নিতাই কি করবে তাহলে? এই উপন্যাসের কবিতাগুলোতে প্রেমের বিভিন্ন পর্যায়ের আকুলতা প্রকট হয়ে আন্দোলিত করে পাঠকমকে । 

১৬.  রাজসিংহ ঃ

বাংলা উপন্যাস যাঁর হাত ধরে বিকশিত হয়, সেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম সেরা এই উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে প্রথম দশে জায়গা করে নেওয়ার উপযুক্ত। বঙ্কিমচন্দ্রের কঠিন ভাষার জন্য অনেকে এই উপন্যাসে হাত দিতে ইতস্তত করেন বটে, কিন্তু এটি না পড়লে বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের শিকড়ের পরিচয় পাওয়া থেকে আপনি বঞ্চিত হবেন। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সঙ্গে মেবারের রাজপুত রানা রাজসিংহের দ্বৈরথ নিয়ে এই উপন্যাস। মুঘলদের বৈবাহিক রাজনীতি, অন্দরমহলের অশান্তি, দরবারি কুটিলতা সুনিপুণ দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন বঙ্কিম। একইসাথে রাজপুত শিবিরের অন্দরমহল, তাদের রক্ষণশীলতা, রাজপুত কন্যার মুঘল বেগম হবার অনীহা, মেবার এর সাথে মুঘলের দ্বন্দ্ব, সবই উঠে এসেছে এই দুর্ধর্ষ কাহিনীতে। মোবারক, দরিয়া, মানিকলালের মত ছোট চরিত্রগুলি ও এই উপন্যাসের সম্পদ। 

১৭. শবনম ঃ

"আমার বিরহে তুমি অভ্যস্থ হয়ে যেও না, আমার মিলনে তুমি অভ্যস্থ হয়ে যেও না।" অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেখানে কি ভালবাসা একটু গৌণ হয়ে যায় না? কে জানে? কিন্তু 'শবনম' সৈয়দ মুজতবা আলীর এমনই এক অনবদ্য সৃষ্টি যে, আপনি এর পরতে পরতে এমন সব লাইনের দেখা যাবে যা আপনার চিরআকাঙ্ক্ষিত ভালবাসার অনুভূতিকে স্পর্শ করে যাবে।

এই উপন্যাসকে একটা চলমান কাব্য বললেও ভুল হবে না। প্রতিটি পাতায় পাতায় কাব্যের ঝংকারে ফুটে উঠে ভালবাসার কাব্যগাঁথা। শবনম-মজনুনের এই কাব্যিক প্রেমের ভুবনে আপনাকে স্বাগতম। খুব কম উপন্যাস সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেয়া যায়, এই বইটি আপনার ভাল লাগবে। কিন্তু, শবনম সম্পর্কে এইটুকু বলতে পারি এই বইটি আপনার মুগ্ধতার সীমাকে ছুঁয়ে যাবে! কারণ, প্রেম বলতে আমাদের যে চিরন্তণ টিপিক্যাল ধারণা তার চেয়েও অনেক উর্ধ্বে এই বই ।




পরবর্তী খবর পড়ুন : বিখ্যাত কিছু বাংলা গান