নতুন মায়ের খাবার তালিকা - New Mom's Food List
Breastfeeding mother's diet

স্তন্যদানকারী মায়ের খাবার -Breastfeeding mother's diet

প্রসবের পরবর্তী কয়েকটা মাস নতুন মায়েদের নিজের শরীরের সঠিক যত্ন নেওয়া আর ঠিকমতো খাবার খাওয়া প্রয়োজন। না হলে, শিশু ও মা উভয়ে অসুস্থ হয়ে যাবেন। মায়েদের মনে রাখতে হবে তাদের শরীর থেকেই পুষ্টি পেয়ে বেড়ে উঠছে শিশু। নিজের শরীর সুস্থ করার জন্য তো বটেই, অন্তত বাচ্চার কথা ভেবেও মনোযোগ দিন কী খাচ্ছেন না খাচ্ছেন তার ওপরে।

সন্তানের জন্মের পর মায়েদের এমন সমস্ত খাবার খাওয়া দরকার, যার মাধ্যমে শিশুরাও সম্পূর্ণ পুষ্টি পেতে পারে। তারও পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদরা।

প্রসূতি মায়ের পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা কী

একজন প্রসূতি মা এর অন্যান্য নারীর তুলনায় পুষ্টি চাহিদা বেশি তাই তার বেশি খেতে হবে। নবজাতকের, মায়ের নিজের দেহের ক্ষয়পূরণ এবং মায়ের দুধের মাধ্যমেই নবজাতক সব পুষ্টি উপাদান পেয়ে থাকে তাই প্রসূতি মায়ের অতিরিক্ত পুষ্টি দরকার।

স্বাভাবিকের চেয়ে একজন প্রসূতি/দুগ্ধদানকারী মায়ের অতিরিক্ত ৭৫০ ক্যালরির সাথে ২৬ গ্রাম বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। সাধারণত প্রসূতি মায়ের বুকে দৈনিক ২০-৩০ আউন্স দুধ তৈরি হয়, ২গ্রাম খাদ্য প্রোটিন থেকে দৈনিক ১গ্রাম দুধের প্রোটিন তৈরি হয়। প্রাণিজ প্রোটিন মায়ের দুধের উৎকৃষ্ট উপাদান। তাই প্রসূতি মায়ের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন প্রোটিনের প্রয়োজনীয় পরিমাণের অন্তত অর্ধেক প্রাণিজ প্রোটিন হতে হবে।

স্বাভাবিক অবস্থায় যে পরিমাণ ক্যালরির দরকার হয় দুগ্ধদানকারী মায়ের তার চেয়ে অতিরিক্ত ৫০০ক্যালরি প্রয়োজন। প্রতিদিন ২০০০-২৫০০ ক্যালরির খাদ্য প্রসূতি মা কে খেতে হবে। একবারে বেশি না খেয়ে বারবার খেতে হবে।


প্রসূতি মায়ের খাদ্য তালিকা

প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারঃ-

স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর ৫০গ্রাম প্রোটিন, গর্ভবতী মায়ের ৬৫গ্রাম প্রোটিন এবং দুগ্ধদানকারী মায়ের ৭৫গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। প্রোটিন দুধের সাথে ক্ষরিত হয়ে শিশুর শরীরের গঠন ও মেরামতে কাজে লাগে, মায়ের কাজেও লাগে। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, সয়াবিন, বাদাম ও সিম জাতীয় খাদ্যে প্রোটিন বিদ্যমান।

ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবারঃ-

দৈনিক ক্যালরির ১৫-২৫ গ্রাম ক্যালরির চাহিদা পূরণ হয় এই ফ্যাট থেকে। স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতিদিন ২০গ্রাম ফ্যাট, গর্ভবতী মায়ের ৩০ গ্রাম আর দুগ্ধদানকারী/ প্রসূতি মায়ের ৪৫গ্রাম ফ্যাট প্রয়োজন। মাছের তেল, সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, কাঠ বাদাম এসবে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বেশি থাকে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সম্পন্ন খাবার প্রসূতি মায়ের জন্য বিশেষ প্রয়োজন।

আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবারঃ-

থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজন আয়োডিন। থাইরয়েড শরীরের পুষ্টি, বিকাশ ও বৃদ্ধির সাথে জড়িত। দুগ্ধদানকারী মায়ের প্রতিদিন ১৯০ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন প্রয়োজন। দুধ, সবজি ও সামুদ্রিক খাদ্যবস্তুতে আয়োডিন বিদ্যমান।

ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবারঃ-

শিশু ও মা দুজনের জন্যই এই ভিটামিন প্রয়োজনীয়। প্রতিদিন ৪৫০-৫০০মাইক্রোগ্রাম এটি খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। শাকসবজি, বাদাম, ইস্ট এ এই ভিটামিন বিদ্যমান।

ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবারঃ-

ভিটামিন-এ চোখের গঠন ঠিক করে, শরীরের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। প্রতিদিন ৮০০-১০০০ মাইক্রোগ্রাম এটি প্রয়োজন। দুধ, ঘি, হলুদ-কমলা রঙের সবজি, গাজর, কুমড়ো, আম ও অন্যান্য রঙিন সবজিতে ভিটামিন-এ বিদ্যমান।

ভিটামিন বি-৬ সমৃদ্ধ খাবারঃ-

প্রসূতি মায়ের দৈনিক ১.৭-২.০মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৬ প্রয়োজন। শরীরে প্রোটিনের বিপাক ও লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে ভিটামিন বি-৬ ভূমিকা রাখে। মাছ, মাংস, শস্য দানা ও সিম জাতীয় খাদ্যে ভিটামিন বি-৬ পাওয়া যায়।

জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবারঃ-

বিভিন্ন উৎসেচক তৈরি ও কাজের জন্য জিঙ্ক প্রয়োজন। এটি একটি ধাতব পদার্থ। একজন প্রসূতি মায়ের প্রতিদিন ১০-১২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক প্রয়োজন। বাদাম, দুধ, মাংস, সামুদ্রিক খাবার ও শস্য দানা জাতীয় খাবারে জিঙ্ক থাকে।

তরল জাতীয় খাবারঃ-

পানিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ , সাধারণত সব খাদ্যের মধ্যে কম বেশি পানি  খাবার থাকে, তবে কিছু কিছু খাবারে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে সে ধরনের খাবার খাওয়া অবশ্যই দরকার। খাদ্য গ্রহণ পরিপাক ও শোষণ  করতে পানির  পান করা প্রয়োজন।

পানি রক্ত তরল রাখে এবং  মলমূত্রের সাথে দূষিত পদার্থের দেহ থেকে বের করা যায় টক্সিন  এর  মতো পদার্থগুলো বের করে দেন। পানির অভাবে হজমের  সমস্যা দেখা দেয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয় এর কারণে পানি বেশি বেশি পান করা উচিত।

 নবজাতক মায়ের দুধ খাওয়ার মাকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা আবশ্যক সন্তান জন্মের পর অনেক সময় মায়ের পানিশূন্যতা দেখা দেয় মায়ের পানিশূন্যতা রোধে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর আগে মায়ের পানি পান করা উচিত। দুধ, ফলের রস বা বিশুদ্ধ পানি পানীয় হিসেবে খাওয়া যাবে।

ফাইবার/আঁশ জাতীয় খাদ্যঃ-

ফাইবার এক ধরনের শর্করা জাতীয় খাবার যা বিভিন্ন সবজিতে থাকে। ফাইবার খাদ্য হজমে সাহায্য করে। মায়ের খাদ্য পরিপাক ঠিকমতো হলে শিশুও ভালো থাকবে। ফল, শাক-সবজি, আটা, সজনে ইত্যাদি তে ফাইবার বিদ্যমান।

সুষম খাবারঃ-

সুষম খাদ্য হল এমন একটি খাদ্য যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণে এবং অনুপাতে বিভিন্ন ধরণের খাবার থাকে যাতে ক্যালোরি, প্রোটিন, খনিজ, ভিটামিন এবং বিকল্প পুষ্টি পর্যাপ্ত থাকে এবং একটি ছোট অংশ পুষ্টির জন্য সংরক্ষিত থাকে।

এছাড়াও, সুষম খাদ্যে জৈব-অ্যাকটিভ ফাইটোকেমিক্যাল যেমন ডায়েটারি ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং নিউট্রাসিউটিক্যালস থাকা উচিত যা ইতিবাচক স্বাস্থ্য উপকারী। একটি সুষম খাদ্যে কার্বোহাইড্রেট থেকে মোট ক্যালোরির 60-70%, প্রোটিন থেকে 10-12% এবং ফ্যাট থেকে মোট ক্যালোরির 20-25% থাকা উচিত।

খনিজ লবনঃ-

ক্যালসিয়াম সর্বাধিক পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ লবণ। ক্যালসিয়াম আমাদের হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত ও শক্তিশালী করে, ক্ষয়রোধ করে এবং আর্থ্রারাইটিস, বাতজাতীয় রোগের সাথে লড়াই করে। নতুন মায়ের রক্তশূন্যতা বা এনিমিয়া দূর করার জন্য আয়রন প্রতিরোধের জন্য ক্যালসিয়ামের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়াও আয়োডিন গলগণ্ড, দুর্বলতা, স্তন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে থাকে। মাছের তেল, বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ, আয়োডিন মিশ্রিত খাবার লবণ হতে খুব সহজেই আয়োডিন পাওয়া যায়। কডলিভার অয়েলে আয়োডিন ছাড়াও আছে একটি মূল্যবান উপাদান ভিটামিন ‘এ’ যা অন্ধত্ব ও রাতকানা প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া আরো আছে ক্যালসিয়াম, যা শিশুদের হাড় ও দাঁত মজবুত করে।


নতুন মায়েরা কী খাবেন না

পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি কিছু খাবার আছে যা মায়েদের এড়িয়ে চলতে হয়। অনেক সময় দেখা গেছে এই খাবারগুলো খাওয়ার পর বাচ্চারা মায়ের দুধ খেতে চায় না অথবা দুধ খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই মায়েদের সচেতন থাকতে হয় সর্বক্ষণ। বাচ্চাদের দুধ খাওয়ানোর সময় এমন কোন খাবার খাওয়া যাবে না যাতে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ে।

লেবু জাতীয় ফল:

লেবু জাতীয় সকল ফল এই সময় এড়িয়ে যাওয়া উচিত। এই জাতীয় ফলে অ্যাসিড থাকে যা শিশুর বুক জ্বালা পোড়া, পেট ব্যথার কারণ হতে পারে। এমনকি শিশুর শরীরে র‍্যাশ বা অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। আপনি লেবুর পরিবর্তে অন্য ভিটামিন সি এর উৎস যেমন পেঁপে আম, খেতে পারেন।

চকলেট:

এই সময় আপনার প্রিয় চকলেট খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে। চকলেট বিশেষ করে ডার্ক চকলেটে ক্যাফিন থাকে যা আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। চকলেট খাওয়ার পর দুধ খেলে আপনার বাচ্চা যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে বা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দেয় তবে চকলেট খাওয়া বন্ধ করে দিন।

ব্রকোলি:

ব্রকোলির পুষ্টিগুণ অনেক, কিন্তু বাচ্চা দুধ খাওয়ানোর সময় ব্রকোলি, ফুলকপি জাতীয় গ্যাস সৃষ্টিকারী সবজি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এই খাবারগুলো পেটে গ্যাস সৃষ্টি করে থাকে যা বাচ্চার ক্ষতি করে।

কফি:

আপনি যখন কফি বা চা পান করেন তখন ক্যাফিনের কিছু অংশ দুধের সাথে মিশে যায়। ছোট শিশুদের বড়দের মত ক্যাফিন শোষন করার ক্ষমতা থাকে না। ফলে ওদের পেটে ব্যথা, বুক জ্বালাপোড়া, অনিদ্রা দেখা দিতে পারে। তাই বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

রসুন:

আপনার যদি কাঁচা রসুন বা রসুনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তবে আজই এই অভ্যাস ত্যাগ করুন। রসুনের গন্ধ বুকের দুধের মধ্যে আসে যা আপনার বাচ্চা পছন্দ নাও করতে পারে।

কিছু মাছ:

মাছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। কিন্তু কিছু মাছ যেমন টুনা মাছ, আঁশযুক্ত মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন।

দুগ্ধজাত খাবার:

দুধ এবং দুধ জাতীয় খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে। কিন্তু শিশুরা এই জাতীয় খাবার সহজে হজম করতে পারে না। বিশেষ করে গরুর দুধের প্রোটিন। চিজ, পনির, টকদই বা অন্য কোন দুগ্ধ জাতীয় খাবার মা খেলে তা দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে চলে যায়। এতে শিশুর হজমের সমস্যা, পেটে গ্যাস বা পেট ব্যথা সহ অনেক সমস্যা দেখে দিতে পারে।

মুখে ব্রণ হলে কি করনীয়
শোবার ঘর অভ্যন্তর নকশা
মেদ ও ওজন কমানোর উপায়
চুল পড়া বন্ধ এবং মাথায় নতুন চুল গজাতে ঘরোয়া উপায়