লবঙ্গ এর ২০টি গুনাগুণ ওউপকারিতা

পরিচিতিঃ

লবঙ্গ আমাদের অতিপরিচিত একটি মসলার নাম।এই বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium aromaticum।  ইংরেজী-Clove,বাংলায় লবঙ্গ বা লং বলে । রান্নার স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশেই এখনো ঔষধি উপাদান হিসেবে এর ব্যবহার করা হয়। লবঙ্গের ভেতর রয়েছে ‘ইউজেনল’ নামের একটি যৌগ, যা এর সুগন্ধের মূল কারণ। লবঙ্গ খুবই ঝাঝালো, উপাদেয়, ঘ্রাণময় একটি মসলা।  মূলত ইন্দোনেশিয়ায় এর জন্ম। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন  দেশ ঘুরে বিশ্বের সর্বত্র এই মসলা ছড়িয়ে পড়েছে। এর রয়েছে যথেষ্ট পুষ্টিগুণ। শুধু মসলা নয়  ওষুধ হিসেবেও লবঙ্গের বেশ গুরুত্ব আছে। এতে ২০-২৫ শতাংশ ক্লোভ  তেল এবং ১০-১৫ শতাংশ টাইটার পেনিক এসিড থাকে, যার ফলে এটা  খেতে ঝাঁজালো। লবঙ্গ গাছ ৩০  থেকে ৪০ ফুট উঁচু হতে পারে। চিরসবুজ, বহুসংখ্যক নরম ও নিম্নগামী ডাল  চারদিক ছড়িয়ে পড়ে। ছাল ধূসর বর্ণ ও মসৃণ। পাতা সরল ও বিপরীত।  উপবৃত্তাকার, পাঁচ ইঞ্চির মতো লম্বা। কচি পাতা লালচে।

লবঙ্গ এর ২০টি গুনাগুণ ওউপকারিতা

১.দাঁতের নানা সমস্যার সমাধানেঃ

লবঙ্গ দাঁতের ব্যাথায় দারুণ কার্যকর। লবঙ্গ দাঁতের ব্যথা দূরকরে। মাড়ির ক্ষয় নিরাময় করে। লবঙ্গতে উপস্থিত অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান শরীরে প্রবেশ করার পর এমন কিছু বিক্রিয়া করে যে নিমেষে দাঁতের যন্ত্রণা কমে যায়। প্রায় সব টুথপেস্টের কমন উপকরণ এই লবঙ্গ।

২.কফ ও কাশি দূর করেঃ

সর্দিকাশির মহৌষধ হিসেবে লবঙ্গ বহু বছর ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। লবঙ্গ চিবিয়ে রস গিলে খেলে বা লবঙ্গ মুখে রেখে চুষলে সর্দি, কফ, ঠাণ্ডা লাগা, অ্যাজমা, গলাফুলে ওঠা, রক্ত পিত্ত আর শ্বাস কষ্টে সুফল পাওয়া যায়।

৩.ক্যানসার প্রতিরোধেঃ

লবঙ্গ অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের আধার। ইউজেনল একটি শক্তিশালী অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, যা ভিটামিন ই–এর চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি কার্যকরভাবে শরীরে ফ্রি র‍্যাডিকেলের ফলে হওয়া অক্সিডেটিভ ক্ষতি থামাতে পারে। অক্সিডেটিভ ক্ষতির কারণে ক্যানসার হয়ে থাকে।লবঙ্গ ব্রেস্টক্যান্সার, ওভারিয়ান ক্যান্সার প্রতিরোধকরে থাকে।

৪.হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায়ঃ

লবঙ্গে উপস্থিত ফেনোলিক কম্পাউন্ড-ইউজিনল এবং ইউজিনল ডেরিভাটিভস শরীরে প্রবেশ করার পর বোন ডেনসিটির উন্নতি ঘটে। কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে, ইউজেনল হাড়ের ঘনত্ব বাড়িয়ে এটি মজবুত করে থাকে। এ ছাড়া লবঙ্গ ম্যাঙ্গানিজের উৎকৃষ্ট উৎস। ক্যালসিয়ামের মতো এটিও হাড়ের ভেতরের নানাবিধ মিনারেলের ঘাটতিও পুরণ করে। ফলে হাড়ের সমস্যা জনিত যে কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। নারীরা এবং বয়স্ক মানুষদের নিয়মিত লবঙ্গ খেলে হাড়ের সমস্যা অনেকটা কমে যায়।

৫.বমি ভাব কমায়ঃ

ট্রেনে বা বাসে যাওয়ার সময় যদি মাথা ঘুরতে থাকে ও বমি এসে যায়, তাহলে মুখে একটি লবঙ্গ রেখে সেই রস চুষলে বমি ভাব ও মাথা ঘোরা কমে যাবে। গর্ভবতী মায়েরা সকালের বমিবমি ভাব দূর করতে লবঙ্গ চুষতে পারেন। লবঙ্গের সুগণ্ধ বমিবমি ভাবদূর করে।

৬.আলসার নিরাময়েঃ

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, স্ট্রেস বা জিনগত কারণে পেপটিক আলসার বা পাকস্থলীর আলসার হয়ে থাকে। লবঙ্গ দিয়ে তৈরি অ্যাসেনশিয়াল ওয়েল গ্যাসট্রিক মিউকাসের উৎপাদনে সাহায্য করে। এই মিউকাস পাকস্থলীকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে ঢাল হিসেবে কাজ করে।

৭.রক্ত পরিস্কার করেঃ

লবঙ্গ শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদানগুলো সরিয়ে রক্তকে পরিশোধন করতে ভূমিকা রাখে। রক্তকে পরিস্কার করে।

৮.খাবারে রুচি বৃদ্ধি করেঃ

লবঙ্গ খিদে বাড়ায়, রুচীর পরিবর্তণ আনে।বিভিন্ন রোগ বিশেষ করে পেটের রোগে এবং জ্বরে ভোগার পরে খাবারে অরুচি দেখা দেয়। ভাত-রুটি, মাছ-মাংস, মিষ্টান্ন বা যে কোন উপাদেয় খাবারে পর্যন্ত রুচি হয় না সেক্ষেত্রে লবঙ্গ চুর্ণ সকালে খালি পেটে দুপুরে খাবারের পরে খেলে খাবারে রুচি ফিরে আসবে।

৯.মাথা ব্যথা কমায়ঃ

ধোঁয়া, রোদ এবং ঠান্ডার জন্য শ্লেষ্মা বেড়ে নানা ধরনের মাথা ব্যথা বা মাথার রোগ দেখা দিতে পারে। মাথা ব্যথা কমাতে লবঙ্গের উপকারিতা অপরিসীম। গরম জলে পাঁচ মিনিট লবঙ্গ ফুটিয়েও সেই পানি পান করলেেউপকার পাওয়া যায় ।

১০.ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণেঃ

লবঙ্গের আর একটি উপাদান হল নাইজেরিসিন। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই উপাদানের জন্যই রক্ত থেকে শর্করা বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেওয়া, ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলির কার্যক্ষমতা বাড়ানো ও ইনসুলিন নিঃসৃত হওয়ার পরিমাণ বাড়ানোর মতো কাজ ভাল ভাবে হয়। তাই মধ্য মাত্রার ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে লবঙ্গ ভাল কাজে দেয়

১১.পিপাসা রোগে উপকারিঃ

যারা পিপাসা রোগে প্রায়ই আক্রান্ত হন; বারবার পানি পান করতে হয়। তাদের সকালে ও বিকালে লবঙ্গ খেলে-পিপাসা চলে যাবে।

১২.যৌন রোগে উপকারিঃ

লবঙ্গ যৌন রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য খুবই উপকারি। এর সুবাস অবসাদ দূর করে, শরীর ও মনের ক্লান্তি ঝরিয়ে দেয়। যৌন শক্তি বৃদ্ধি করে।

১৩.ত্বকের দাগ দূর করেঃ

নিয়মিত লবঙ্গের তেল দিয়ে ত্বক ম্যাসাজ করুন। এতে আপনার ত্বকের সব ধরনের দাগ দূর হবে এবং ত্বক নরম ও মসৃণ হবে। তবে ঘুমানোর আগে এই তেল দিয়ে ম্যাসাজ করলে ভালো ফল পাবেন।

১৪.হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করেঃ

হজমে সহায়তা করে এমন এনজাইমনিঃসরণের মাধ্যমে এবং অ্যাসিড ক্ষরণের মাধ্যমে লবঙ্গ আমাদের হজম ক্ষমতা সক্রিয় করে তোলে। এরাফ্লাটুলেন্স, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, ডিসপেপসিয়া এবং নসিয়া কমাতে সাহায্য করে। এটি শরীরের রক্ত প্রবাহেরও উন্নতি ঘটায়।

১৫.ব্রণ দূর করেঃ

লবঙ্গ ব্রণ দূর করতে বেশ কার্যকর। তবে ব্রণের ওপর সরাসরি লবঙ্গ ব্যবহার না করাই ভালো। লবঙ্গ গুঁড়ো করে এর সঙ্গে সামান্য অলিভ অয়েল অথবা নারকেল তেল মিশিয়ে ব্রণের ওপর লাগান। ১০ মিনিট পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন ত্বকের ব্রণ সহজেই দূর হয়ে যাবে। লবঙ্গ ব্রণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ব্রণের দাগ দূর করতে লবঙ্গের পেস্ট ব্রণের ওপরে দিয়ে রাখুন। লবঙ্গ খেলেও ব্রণ হবে না।

১৬.চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায়ঃ

নিয়মিত লবঙ্গে পেষ্ট চুলে দিলে চুল পড়া কম করতে সাহায্য করে এবং চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। লবঙ্গ তেলে থাকা ইউজেনাল চুলের বিকাশে  সাহায্য করে।

১৭.লিভারের কর্মক্ষমতা বাড়ায়ঃ

লবঙ্গে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রবেশ করার পর দেহের মধ্যে উপস্থিত টক্সিক উপাদানদের বের করে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শুধু লিভার নয়, শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রসঙ্গত, এই প্রকৃতিক উপাদানটিতে একাধিক হেপাটোপ্রটেকটিভ প্রপার্টিজও রয়েছে, যা এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

১৮.হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতিতেঃ

হার্টের সুস্বাস্থ্যের জন্য লবঙ্গ খুব কার্যকরী। এখানে ইউজেনলের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লখযোগ্য। এন সি বি আই – এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানতে পারা যায় যে ইউজেনল সমৃদ্ধ ঔষধি গাছের ব্যবহারে উচ্চ রক্তচাপ কমে যায়। এটিকে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া উপাচার বলা যেতে পারে। লবঙ্গ উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে রক্তচাপের ফলে যে হার্টের রোগগুলো হয়ে থাকে সেসবও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। অবশ্য এই বিষয়ে আরও  গবেষণা প্রয়োজন।

১৯.শ্বাস কষ্ট কমায়ঃ

লবঙ্গ চিবিয়ে রস গিলে খেলে শ্বাস কষ্ট ও হাঁপানিতে আরাম পাওয়া যায়। লবঙ্গের রস মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায় ।

২০.রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেঃ

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে লবঙ্গ বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। লবঙ্গতে রয়েছে প্রদাহ নাশক প্রভাব। এছাড়া এনসিবিএই এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে লবঙ্গ হিউমোরাল ইমিউনো রেসপন্স বাড়িয়ে আর সেল মেডিয়াটেড ইমিউনিটি কম করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে ।

 পুষ্টি উপাদান

১ চামচ গুঁড়া লবঙ্গতে আছে ৬ ক্যালরি, ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১ গ্রাম ফাইবার, দৈনন্দিন চাহিদার ৩ শতাংশ ভিটামিন সি, ২ শতাংশ ভিটামিন কে এবং ৫৫ শতাংশ ম্যাঙ্গানিজ। এতে কিছু পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ভিটামিন ই–ও আছে। এ ছাড়া আছে সামান্য ক্যারোটিন পিগম্যান্ট, যা ভিটামিন এ–তে পরিণত হয়।


পরবর্তী খবর পড়ুন : আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান