গর্ভবতী মহিলাদের ফলিক এসিড আয়রন ও জিংক ট্যাবলেট

গর্ভবতী মহিলাদের ফলিক এসিড আয়রন ও জিংক ট্যাবলেট,ভিটামিন

গর্ভবতী মহিলাদের ফলিক এসিড

ফলিক নামের এই অ্যাসিডটি ফোলেটের একটি সিন্থেটিক বা কৃত্রিম সংস্করণ যা ভিটামিন বি ৯ এর একটি প্রকার যা প্রাকৃতিকভাবে সবুজ শাক সবজি, ফল, বিনস, মাশরুম, ডিমের কুসুম, আলু, দুধ ইত্যাদি খাবারের মধ্যে পাওয়া যায়। এই ভিটামিনটি স্বাস্থ্যকর নতুন কোষ তৈরি করার জন্য এবং শরীরের অন্য কিছু খুব গুরুত্বপূর্ণ কার্যকলাপ বজায় রাখার জন্য জরুরি। ফলিক অ্যাসিড প্রাথমিকভাবে ফোলেটের অভাবের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়। এটা রক্ত ​​এবং তার উপাদান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান পিউরিন এবং পিরিমিডিন সংশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি অ্যানিমিয়া, কিডনি ডায়ালিসিস, অ্যালকোহলিজম বা মদ্যপ অবস্থা, লিভারের রোগ এবং অন্ত্রের দ্বারা অনুপযুক্ত পুষ্টির শোষণ প্রতিকারের জন্য নির্ধারিত। অন্যান্য ওষুধের তুলনায় ফলিক অ্যাসিডের সবচেয়ে বিশিষ্ট জিনিসটি হল যে গর্ভবতী মহিলাদের বা প্রত্যাশিত মহিলাদের এই ওষুধটি গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করা হয়। গর্ভবতী মহিলাদের দ্বারা ফলিক অ্যাসিডের ব্যবহার শিশুর মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ড গঠনের ত্রুটিগুলির সম্ভাবনা হ্রাস করতে সহায়তা করে। গর্ভবতী হওয়ার পরিকল্পনাকারী মহিলাদের সাধারণত ফলিক অ্যাসিডের একটি দীর্ঘ কোর্স গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেহেতু এর প্রভাবটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি অনুযায়ী পৃথক হয় তাই এই ওষুধ গ্রহণ করার পূর্বে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ফলিক এসিড কি

ভিটামিন বি পরিবারের এক সদস্য ফলিক অ্যাসিড। ভিটামিন বি_৯ এর রাসায়ানিক নাম ফলিক অ্যাসিড।

গর্ভবতী মহিলাদের ফলিক অ্যাসিড

গর্ভাবস্থার আগে থেকে দৈনিক ৬০০ মিলিগ্রাম ফলিক অ্যাসিড খেলে শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্ট নামে এক মারাত্মক জন্মগত সমস্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে । ভিটামিন বি_৯ কোষ বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যে রোজকার খাবারে এই ভিটামিনটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

যে খাবার ফলিক অ্যাসিড থাকে

মুসুর ডাল, কড়াইশুঁটি ও মটর, সয়াবিনে পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড আছে। এদের মধ্যে সব থেকে বেশি রয়েছে মুসুর ডালে। ১ কাপ (প্রায় ২০০ গ্রাম) মুসুর ডালে প্রায় ৩৫৮ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। পুরো সিদ্ধ করা মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ২২ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড পাওয়া যায়। পালং শাক, সরষে শাক, নটে শাক, কলমি শাক, ছোলা শাকের মত সবুজ শাকে ভিটামিন বি_৯ থাকে। রোজকার ডায়েটে একটি শাক থাকা দরকার। বিট ফলিক অ্যাসিডের আর এক অন্যতম উৎস। ১৩০ গ্রাম বিট থেকে ১৩৮ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট পাওয়া যায়। বিটের রস খেলে হবু মায়েদের ফলিক অ্যাসিডের জোগানের পাশাপাশি রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

কতটুকু ফলিক এসিড দরকার

আমাদের দেশে ডাক্তাররা গর্ভধারণের তিন মাস আগে থেকে গর্ভধারণের তিন মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড গ্রহনের পরামর্শ দেন। আমেরিকান কিছু স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা আরো বেশি পরিমানে ফলিক এসিড গ্রহনের পরামর্শ দেয়। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিত প্রতিদিন ১০০০ মাইক্রোগ্রামের বেশি ফলিক এসিড গ্রহণ করা উচিত নয়।

ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়ার নিয়ম

তাই গর্ভধারণের পরিকল্পনার শুরুতেই নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করে দেওয়া ভালো। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের নির্দেশনা হলো, সন্তান নেওয়ার অন্তত এক মাস আগে থেকে প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড বড়ি খাওয়া শুরু করে দেওয়া উচিত। প্রথম তিন মাস পর্যন্ত এটি চালিয়ে যাওয়া

গর্ভবতী মহিলাদের আয়রন

আয়রনের ঘাটতি হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়। অনেক শিশুর জন্মের পর থেকেই হিমোগ্লোবিনের অভাব বা রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় আয়রনের ঘাটতির কারণে। তাই গর্ভাবস্থায় মাকে প্রচুর আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কচু শাক, লাল শাক, পালং শাক, কাঁচা কলা, ডালিম, বিটস, বাদাম, ছোলা, খেজুর, কলিজা, শিং মাছ, মাগুর মাছ ইত্যাদিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন।

গর্ভাবস্থায় আয়রন ট্যাবলেট 

বেশিরভাগ চিকিত্সক গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহের পরেই আয়রনের ট্যাবলেটগুলির পরামর্শ দেন। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে এগুলি হজম করা কঠিন এবং প্রথম ত্রৈমাসিকে এর প্রয়োজনও হয় না। আপনার খাওয়ার আগে বা তার কমপক্ষে এক বা দুই ঘন্টা আগে আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে।

ক্যালসিয়াম

গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ

হাড়ের শক্তি বজায় রাখার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন । গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম গ্রহণ ভ্রূণের কঙ্কালের বিকাশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার বাচ্চা আপনার শরীর থেকে বিশেষত তৃতীয় ত্রৈমাসিকের দিকে শোষনের মাধ্যমে তার ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করে।

গড় হিসাবে, ভ্রূণ গর্ভকালীন এর শেষে 30g ক্যালসিয়াম দাবি করে।

ভ্রূণের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময় 50mg / দিন এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় 250 মিলিগ্রাম / দিন প্রয়োজন।

ক্যালসিয়াম শিশুর হাড়ের গঠনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। মা যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম না খান তবে শিশুর হাড় শক্ত হবে না। এমনকি ক্যালসিয়ামের অভাবে গর্ভাবস্থায় মায়ের কোমর ও পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা অনুভূত হতে পারে।

ক্যালসিয়াম খাবার

দুগ্ধজাত খাদ্য যেমন দুধ, দই, পনির ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, মায়ের যদি হাই প্রেশার থাকে তবে দুধ না খেয়ে তাকে দই খেতে হবে। এছাড়াও প্রতিদিন ভাতের সাথে একটি কাঁচা মরিচ অনেকটা ক্যালসিয়ামের যোগান দিয়ে থাকে। মাছ ও মাছের কাটায় থাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম। মটরশুঁটি, বিভিন্ন ধরণের বাদাম, ছোলা ও শাকসবজি এবং ফলমূলেও থাকে ক্যালসিয়াম। এরপরও ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভবতী মাকে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে দেওয়া হয়।

জিংক

গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ফলিক এসিডের মত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মতোই জিংক গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধির ও পরামর্শ দেয়া হয়। এর কারণ গর্ভাবস্থায় জিংকের ঘাটতির ফলে মায়ের অসুস্থতা, দীর্ঘায়িত গর্ভকাল, অপর্যাপ্ত লেবার পেইন এবং ভ্রূণের বৃদ্ধির বৈকল্য ইত্যাদি সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।

গর্ভাবস্থায় জিঙ্কের পরিমাণ কম হলে কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া দেহের বৃদ্ধি রোধ বা বামনত্ব হতে পারে। এছাড়াও জিংকের অভাবে পরবর্তীতে শিশুর ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও কনজাংকটিভার প্রদাহ, পায়ে বা জিহ্বায় ক্ষত, মুখের চারপাশে ক্ষত, আচরণগত অস্বাভাবিকতা, অমনোযোগিতা, বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয়। ভেড়া ও গরুর মাংস,ফুলকপি,সবুজ শিম, টমেটো ইত্যাদিতে জিংক রয়েছে। সামুদ্রিক মাছ, গরু-খাসির কলিজা, আটা-ময়দার রুটি, দুগ্ধজাত খাদ্য, শিমজাতীয় উদ্ভিদ, মসুর ডাল, চীনাবাদাম, মাশরুম, সয়াবিন ও ঝিনুকে জিংক পাওয়া যায়।

ভিটামিন-এ

হাড় ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহের গঠনের জন্য ভিটামিন  এ প্রয়োজন৷ গর্ভস্থ শিশুর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বেড়ে ওঠা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর থাকা, দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করা এবং সার্বিকভাবে বেড়ে ওঠায় ‘ভিটামিন এ’ প্রয়োজন। গর্ভে থাকা শিশু যেহেতু সব পুষ্টি মায়ের মাধ্যমেই পায়, তাই গর্ভবতী মায়ের শরীরে ভিটামিন এ-এর এই চাহিদা পূরণ হওয়া দরকার। WHO-এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ৮০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে খাবারের তালিকায় থাকা চাই মুরগির কলিজা, ডিম, গাজর, আম, গাঢ় কমলা ও হলুদ রঙের ফল এবং গাঢ় সবুজ রঙের শাক-সবজি।

ভিটামিন বি-১, বি-২ ও নায়াসিন

ভিটামিন-বি পরিবারভুক্ত ৬টি ভিটামিনের মধ্যে গর্ভাবস্থায় চাহিদা বেড়ে যায় ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিন, বি-২ বা রিবোফ্লাবিন ও বি-৩ বা নায়াসিনের। বি-ভিটামিন ডায়জেস্টিভ সিস্টেমকে চালু রাখে। ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি চামড়ার শুষ্কভাব কমিয়ে সতেজ রাখে।গর্ভাবস্থায় যেহেতু হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পেট, কোমর, গলা-এসব জায়গার চামড়ার রং পরিবর্তন হয়, পেটের চামড়া স্ফিত হওয়ায় টান লাগে, তাই বি-ভিটামিন এই সময় চামড়ার দেখভালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘রেড মিট’, কলিজা, ডিম, কলা, কিডনি, বিনস, পালংশাক, কাঠবাদাম ও দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি পাওয়া যায়।

ভিটামিন-সি

ভিটামিন সি এর সাহায্যে শরীর সহজেই শাকসবজি থেকে আয়রন শোষণ করে নিতে পারে, রক্তশূন্যতার সম্ভাবনা কমায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।এ জন্য ডাক্তার বা পুষ্টিবিদেরা আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরপরই লেবু, কমলা, বাতাবিলেবু বা আমলকী খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে ভ্রূণের মানসিক বৃদ্ধিতে ভিটামিন-সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন-সি ফলিক অ্যাসিডকে কার্যকর করে তোলার চালিকাশক্তি।গর্ভের শিশুর মাংসপেশি ও হাড় গঠনের কোলাজেন প্রোটিনের প্রয়োজন। ভিটামিন-সি কোলাজেন তৈরিতেও সাহায্য করে।IOM এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের দিনে ৮৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন – আমলকী, পেয়ারা, কমলা লেবু, বাতাবি লেবু, সবুজ শাক-সবজি,  টমেটো এবং আলু খেতে হবে৷ মনে রাখবেন বেশিক্ষণ রান্না করলে ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়৷

ভিটামিন-ই

ভিটামিন ই রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে৷ আপেল, বাদাম, গাজর, বাঁধাকপি, ডিম, অলিভ তেল ও সূর্যমুখি বীজে ভিটামিন ই পাওয়া যায়৷