গারো উপজাতির পরিচিতি - Introduction to Garo Tribe
Garo people

গারো উপজাতির পরিচিতি - Introduction to Garo Tribe

গারো ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় ও বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায়। ভারতে মেঘালয় ছাড়াও আসামের কামরূপ, গোয়ালপাড়া ও কারবি আংলং জেলায় এবং বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ছাড়াও টাঙ্গাইল, সিলেট, শেরপুর, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঢাকা ও গাজীপুর জেলায় গারোরা বাস করে।

গারোরা ভাষা অনুযায়ী বোডো মঙ্গোলীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জাতিগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে অনেক গারোই নিজেদেরকে মান্দি বলে পরিচয় দেন। গারোদের ভাষায় 'মান্দি' শব্দের অর্থ হল 'মানুষ'।

গারোদের ভাষা

গারোদের ভাষার নাম আচিক ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, গারোরা যে ভাষায় কথা বলে তা মূলত সিনো-টিবেটান (Sino Tibetan) ভাষার অন্তর্গত টিবেটো বার্মান (Tibeto Burman) উপ-পরিবারের আসাম-বার্মা শাখার অন্তর্গত বোডো বা বরা (Bodo/Bora) ভাষা উপ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। গারোদের কোনো লিপি বা অক্ষর নেই।

গারোদের বসবাস

ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা, ভালুকা, ফুলবাড়িয়া, ফুলপুর, হালুয়াঘাট, জামালপুর ও শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী, নকলা, নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতি, বখশিগঞ্জ, টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল, মধুপুর, নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা, দুর্গাপুর, কলমাকান্দায় গারোদের বসবাস। নবম-দশম শতাব্দিতে বাংলাদেশে গারো পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমিতে এদের বসতি স্থাপনের কথা ময়মনসিংহের সুসং দুর্গাপুরে গারো রাজ্য প্রতিষ্ঠার বিবরণে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে যারা পাহাড়ে বাস করে, তারা ‘আচিক’ নামে পরিচিত। ‘আচিক’ মানে খাঁটি মানুষ। আর যারা সমতল ভূমিতে বাস করে তারা ‘মান্দি’ নামে পরিচিত। ‘মান্দি’ মানে মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

গারোদের ঘরবাড়ি

গারোদের ঘরগুলি সাধারণত বাঁশের দেয়াল এবং খড়ের ছাদ দিয়ে তৈরি। কিছু বাড়িতে খড়ের ছাদ সহ কাদামাটির দেয়াল রয়েছে। গারোদের  ঘরগুলি সাধারণত ৬ ফুট প্রস্থ এবং ১২ ফুট দীর্ঘ হয়। তাদের বাড়ির সামনের স্থান ফাঁকা থাকে।


গারোদের সমাজ ব্যবস্থা

গারো সমাজে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়। নারী পরম্পরায় গারোদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারিত হতে থাকে। সম্পত্তি শুধু মেয়েদের, পুরুষদের উত্তরাধিকার বলতে কিছুই নেই। তবে পরিবারের সকল কন্যা সম্পত্তির অংশীদার হয় না। গৃহকর্ত্রী বা তার মাচং (নিজ গোষ্ঠী) কর্তৃক নির্বাচিত একজন কন্যাই সকল সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে থাকেন। এ নির্বাচিতা কন্যাকে গারো ভাষায় নকনা বলা হয়। সাধারণতঃ পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যাকেই নকনা নির্বাচিত করা হয়। নকনার জন্য পিতার আপন ভাগ্নেকে জামাই হিসেবে আনা হয়। এই জামাইকে গারো ভাষায় নকরম বলা হয়। যদি পিতার ভাগ্নে না থাকে তবে পিতার মাচং থেকে অন্য কোন ছেলেকে এনে নকরম বানানো হয়।

বিভিন্ন গবেষকগণ বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গারো বর্ণমালা আবিষ্কার করেছেন। সেগুলো উচ্চ গবেষণার জন্য বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি-তে সংরক্ষণ করা আছে। গারোদের সমাজে বেশ কয়েকটি দল রয়েছে। সাংমা, মারাক, মোমিন, শিরা ও আরেং হচ্ছে প্রধান পাঁচটি দল।

গারোদের দৈহিক বৈশিষ্ট্য

গারোদের দৈহিক আকৃতি মাঝারি ধরনের, চ্যাপ্টা নাক, চোখ ছোট, ফর্সা থেকে শ্যামলা রং। দৈহিক গঠনে বেশ শক্তিশালী। তাদের চুল সাধারণত কালো, সোজা এবং বেশ ঘন হয়ে থাকে। আবার অনেক কোকড়া চুলের অধিকারীও লক্ষ্য করা যায়।

গারো সমাজে বিবাহ

সাধারণত অবিভাবকরা বিবাহের আয়োজন করে। এই জাতীয় বিবাহকে বলা হয় দোবিকদোকা। এই প্রথায় সাধারণত মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনদের মধ্যে হয়। বিবাহের দিন পাত্র আড়ালে থাকে। বিবাহের লগ্নে উৎসাহী যুবকরা পাত্রকে ধরে এনে একটি ঘরে আটকে রাখে। প্রথানুসারে পাত্ররা প্রথমে এই বিবাহে রাজী হয় না এবং পালিয়ে যায়। এরপর যুবকরা পাত্রকে পুনরায় ধরে পাত্রীর সাথে একটি ঘরে আটকে রাখে। এবারও পাত্র পালিয়ে যায়। তৃতীয় দিন তাকে ধরে আনে। পাত্র যদি একেবারেই পাত্রীকে পছন্দ না করে, তবে বিবাহ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজি হলে, বিবাহ হয় এবং পাত্রীর সাথে রাত্রিযাপন করে।

গারোদের ভিতরে বিধবা বিবাহ প্রচলিত আছে। এক্ষেত্রে মৃত স্বামীর আত্মীয়দের ভিতরে কাউকে বিবাহ করা হয়। সাধারণত মৃত স্বামীর ছোটো ভাইয়ের সাথে বিবাহ হয়ে থাকে। বহুবিবাহ গারো সমাজে নেই। তবে কোনো কারণে কোনো পুরুষ দ্বিতীয় বিবাহ করতে চাইলে, তাকে প্রথমা স্ত্রী অনুমতি নিতে হয়। এক্ষেত্রে সংসারে প্রথমা স্ত্রীর অধিকার সবচেয়ে বেশি থাকে।

গারোদের ধর্ম

গারোদের প্রধান ধর্ম হলো খ্রিষ্টধর্ম । ঐতিহ্যবাহী ধর্মের নাম সংসারেক। এর অর্থ কেউ জানে না। তবে গবেষকদের মতে সম্ভবত বাংলা সংসার থেকে সংসারেক শব্দটি এসেছে। গারোরা হিন্দু ধর্মালম্বীদের মত পূজা করে থাকে। এদের প্রধান দেবতার নাম তাতারা রাবুগা। গারোরা পুরোহিতকে কামাল বলে। সালজং (Saljong) তাদের উর্বরতার দেবতা এবং সূর্য সালজং এর প্রতিনিধি। ফসলের ভালোমন্দ এই দেবতার উপর নির্ভর করে বলে তাদের বিশ্বাস। সুসাইম (Susime) ধন দৌলতের দেবী এবং চন্দ্র এই দেবীর প্রতিনিধি। গোয়েরা (Goera) গারোদের শক্তি দেবতার নাম। কালকেম (Kal Kame) জীবন নিয়ন্ত্রণ করে বলে গারোদের বিশ্বাস।

অতীতে গারোরা সবাই তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করত। ১৮৬২ সালে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণের পর থেকে বর্তমানে ৯৮ ভাগ গারোরাই খ্রীষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী। খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণের পর থেকে তাদের সামাজিক নিয়ম-কানুন, আচার-অনুষ্ঠানে বেশ পরিবর্তন এসেছে।

গারোদের পোশাক

এক সময় গারোরা গাছের বাকল পরত। বর্তমানে সাধারণ গারোরা জনা বা নেংটি এবং উপরের স্তরের লোকেরা নিজেদের বোনা সংক্ষিপ্ত কাপড় পরে। মেয়েরা এক টুকরা সংকীর্ণ কাপড় সম্মুখ থেকে পিঠের দিকে বেঁধে স্তন আবৃত করে রাখে। পুরুষরা গামছা বা ধুতি পরে। আধুনিক কালে গারোরা বাঙালিদের মতোই পোশাক পড়ে।  গারো মেয়েদের অনেকে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ পরে।

গারোদের খাদ্যাভাস

গারোদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস, ডাল ও শাকসবজি তারা আহার করে। শুঁটকি মাছ গারোদের অন্যতম প্রিয় খাদ্য। দেশের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, ভৈরব, কিশোরগঞ্জের ভাঁটি এলাকায় প্রাপ্ত পুঁটি মাছের হিদল শুঁটকি গারোদের নিকট প্রিয়। তরকারি রান্নায় গারোরা বেশি পরিমাণে কাঁচামরিচ ব্যবহার করে। গারোরা বিভিন্ন সবজি যেমন বেগুন, লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, ঝিংগা, চিচিংগা, করলা, বরবটি, কচু প্রভৃতি খেতে ভালবাসে। ক্ষারজল ছাড়াও গারোরা বর্তমানে বাজার থেকে বিলাতি সোডা কিনে তরকারি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের গারোদের মাঝে খুব কম সংখ্যক পরিবারেই ক্ষারজল ব্যবহূত হয়ে থাকে। ইদানিং গারোদের রান্নার পদ্ধতি এবং রুচি বদলেছে। তারা নাখাম্ তরকারির পাশাপাশি ভর্তা, ভাজি, ডাল, মাছ, মাংস, নিরামিষ প্রভৃতি রান্নায় এবং আহারে প্রতিবেশী বাঙালিদের মতোই পটু হয়ে উঠেছে। এমনকি অবস্থাপন্ন পরিবারের লোকজনেরা খিঁচুড়ি, পোলাও, বিরিয়ানি আহারেও অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। তাদের রান্নার পদ্ধতিও বর্তমানে বাঙালিদের অনুরূপ। শূকরের মাংস, কচ্ছপ এবং কুঁচে তারা পছন্দ করে। বাঁশের কঁচি চারা এবং ব্যাঙের ছাতা গারোদের অন্যতম প্রিয় সবজি।

অতিথি আপ্যায়নে, নানা পালাপার্বণে ধেনো পচুঁই মদ গারোদের নিকট অপরিহার্য। প্রটেস্টটান্ট খ্রিস্টানদের মধ্যে মদপানের প্রচলন নেই বললেই চলে। তবে ক্যাথলিক গারোরা এ ব্যাপারে উদার। কৃষ্টির অঙ্গ হিসেবে এবং শারীরিক পরিশ্রমের পর ক্লান্তি দূর করার জন্যে গারোরা পঁচুই পান করে।


গারোদের প্রধান উৎসব

গারো উপজাতির প্রচলিত উৎসব মূলত কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত। গারো উৎসবগুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে ‘‘ওয়াঙ্গালা‘‘ অনুষ্ঠান।  ফসল কাটার পরে ইশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য উৎসবটি উদযাপন করা হয়। এটির পালনের জন্য কোনও নির্দিষ্ট তারিখ থাকে না। তবে প্রচলিতভাবে, ওয়াঙ্গালা অনুষ্ঠান অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে পালিত হয়।

তারা উদযাপনে জন্য প্রচুর পরিমাণে খাবার এবং বিয়ার প্রস্তুত রাখে। উদযাপনের সবচেয়ে আকর্ষনীয় বিষয় হলো চমকপ্রদ ওয়াঙ্গালা নৃত্য, যাতে পুরুষ এবং মহিলারা জাঁকজমক পোশাকে অংশ নেয়। গারোরা অলঙ্কার পরনের জন্য বিখ্যাত। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই অলংঙ্কার পরিধান করে এবং এতে কনুই রিং, কানের দুল, পুতিঁমালা, হাতির দাঁত এবং চুড়ি অন্তর্ভুক্ত।

গারো সংস্কৃতি

গারোদের অনেকে বাংলা নাচ-গানে পারদর্শী। গারোদের নিজস্ব খেলাধুলা আছে। গারোদের ঘর মাচার উপর নির্মিত, অনেক জাদাপ বা বহু কোঠাবিশিষ্ট এ ঘরগুলি মহিষ ও হরিণের শিং দ্বারা সুসজ্জিত। এক সময় তাদের ঘরে মানুষের করোটিও সাজিয়ে রাখা হতো। এসব করোটি গারো কর্তৃক সমভূমির আক্রান্ত ও নিহত মানুষের। করোটিগুলি আত্মশক্তিবর্ধক, আভিজাত্য ও বীরত্বের প্রতীকরূপে বিবেচ্য ছিল এবং এসব বিক্রয় হতো। গারোদের গোয়াল ও গোলাঘর আলাদা। গ্রামের কেন্দ্রস্থলে নাকপান্থে নামের বাড়িতে যুবকদের বসবাস। এই বাড়িতে আমোদ-প্রমোদের নিমিত্ত এরা একটি কারুকার্যময় ঘর তৈরি করে। এতে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ।