বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কবিতা - Poems on Bangabandhu


১.বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে

অন্নদাশঙ্কর রায়


নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়ো

করে যদি যারা তাঁর পুত্রসম বিশ্বাসভাজন

জাতির জনক যিনি অতর্কিত তাঁরেই নিধন।

নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর,


সারাদেশ ভাগী হয় পিতৃঘাতী সে ঘোর পাপের

যদি দেয় সাধুবাদ, যদি করে অপরাধ ক্ষমা।

কর্মফল দিনে দিনে বর্ষে বর্ষে হয় এর জমা

একদা বর্ষণ বজ্ররূপে সে অভিশাপের।


রক্ত ডেকে আনে রক্ত, হানাহানি হয়ে যায় রীত।

পাশবিক শক্তি দিয়ে রোধ করা মিথ্যা মরীচিকা।

পাপ দিয়ে শুরু যার নিজেই সে নিত্য বিভীষিকা।

ছিন্নমস্তা দেবী যেন পান করে আপন শোণিত।


বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকো নাকো নীরব দর্শক ধিক্কারে মুখর হও। হাত ধুয়ে এড়াও নরক।

২.জানতে হলে তাকে

আশরাফুল আলম পিনটু


শেখ মুজিবকে জানতে হলে

জানতে হবে দেশকে

জানতে হবে শুরু থেকে শেষকে।


ছয় দফাকে জানতে হবে

জানতে হবে হামলাকে

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে।


জানতে হবে তার স্বাধিকার

আন্দোলনের মর্মকে

জেল-জুলুমের আগলভাঙা কর্মকে।


বঙ্গবন্ধু উপাধী আর

জানতে হবে ভোটকে

সত্তর সালে পাকিয়েছিল ঘোঁট কে।


জানতে হবে সাত মার্চের

ঐতিহাসিক ভাষণকে

পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে।

পঁচিশে মার্চ জানতে হবে

স্বাধীনতার লড়াইকে

ভাঙল কারা পাকহানাদার বড়াইকে।


জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধ

ডিসেম্বরের ষোলকে

এ বিজয়ে স্বজনহারা হলো কে।


সেপ্টেম্বর জানতে হবে

আগস্ট কালো রাতকে

জানতে হবে রাজাকারের জাতকে।


জানতে হবে সব ইতিহাস

জানতে তোমার নিজকে

বুকে ফোটাও জাতির পিতার বীজকে।

৩.অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়া


যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা

গৌরী যমুনা বহমান

তত দিন রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।


দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা

রক্তগঙ্গা বহমান

নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়

জয় মুজিবুর রহমান।

৪.এম এ রহমান

বঙ্গবন্ধু


কে বলেছে তুমি নেই তুমি মিশে আছো বাংলায়

বাংলার সবুজের ঘ্রাণে বাঙালির রক্তে মিশে

বাংলার ফুসফুসে তুমি আজও চালাও শ্বাস

বাঙালির চোখে দেখ বাংলার অপরূপ রূপ।।


বাংলাদেশের অনুভবে আছো তুমি অনির্বাণ হয়ে

তবে কে বলেছে তুমি নেই তুমি আছো মুক্তমঞ্চে

বাংলার তরুণের বজ্রকণ্ঠে শিরা উপশিরা রক্তে

পদ্মা যমুনা মেট্রো রেলে বাংলার স্বপ্নে মিশে।।


বাংলার নিউরনে তুমি স্থায়ী স্বপ্ন সবুজের

তুমি যে বিবেক বাঙালির-বাংলার পিতা

কে বলেছে তুমি নেই তুমি আছো বাংলার মাটিতেই

বাংলার পাঁজরের হাড়ে বাঙালির মেরুদণ্ডে।।


তুমি আবে হায়াতের জলে পেয়েছ অমর শরীর

তোমাকে ছালাম বঙ্গবন্ধু-শেখ মুজিবুর রহমান।

৫.মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব

প্রবীর রায়


বিশ্বের একজন বাঙালি শ্রেষ্ঠ

শেখ মুজিবুর রহমান 

পরাধীন বাংলাকে স্বাধীন করে 

নিয়েছ সবার ওপরে স্থান। 


তুমি আছ বাঙালির অন্তরে 

আছ প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে 

মিশে আছ বাঙালির সত্তায় 

থাকবে গৌরবে-গর্বে-বিশ্বাসে। 


তুমি ইতিহাস, তুমি বাংলার ঐতিহ্য 

তুমি বাংলার গৌরব, বাঙালির গর্ব 

তোমার জন্য পেয়েছি আমরা 

এই পৃথিবীতে বাংলা নামক স্বর্গ। 


পৃথিবী নামক পুষ্পকাননে 

তুমি ছিলে এক প্রস্ফুটিত ফুল 

ঘাতকেরা তোমায় হত্যা করে 

করেছিল এক চরম ভুল। 


মরেও অমর তুমি ধরণির বুকে 

তোমার কীর্তি রবে সবার মুখে মুখে 

তুমি ছিলে তুমি আছ তুমি থাকবে 

৬.বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু

সালাউদ্দিন আহমেদ সালমান


বাংলা মায়ের কাঁচা রক্ত ,চুষে খাচ্ছে পাকিস্তান

তাই দেখিয়া শোকে পোড়া বাংলার বুকে জন্ম নিলো শেখ মুজিবুর রাহমান ।


মুক্তির সংগ্রাম অপশক্তিতে নয়, প্রমান করেছে বাঙ্গালী রক্তের বন্যায় ,

পাকবাহিনীর নাপাকি হাত ভেঙ্গে ,বঙ্গবন্ধু দেখিয়েছে স্বাধীনতার সূর্য বাংলায় ।


অবাক বিস্ময়ে নির্বাক পৃথিবী অপলক তাকিয়ে রয় , যেদিন শেখ মুজিবুরের সংগ্রামী ডাকে বাংলাদেশ পেয়েছিল স্বাধীনতার বিজয় ।


চোখে স্বপ্ন মনে বিতৃষ্ণা হাতে নিয়ে প্রাণ বাংলাদেশ কে বাঁচাতে হলে হঠাও পাকিস্তান ,

জন্মভুমির জীবনটাকে করে সম্মান শেখ মুজিব-ই গেয়েছিল স্বাধীনতার গান ।


নির্যাতিত বাঙ্গালীর দুঃখ কষ্ট করলে অবসান স্বদেশ গড়ার নকীব তুমি শেখ মুজিবুর রহমান ।

শহর নগর গ্রাম গঞ্জে ওমর শিল্পীর গান স্বাধীনতার স্বপ্ন পুরুষ তুমি শেখ মুজিবুর রহমান ।


গাছেতে ফল নদীতে জল থাকবে যতকাল রাত্রি -দিন বাংলাদেশ ভুলবেনা কখনও শেখ মুজিবের ঋণ ।

পিতার পড়নে মুজিবকোট চোখে প্রশ্নের জল তোরা আজো কেন করলিনা নিপাত রাজাকারের দল '

শস্য শামল সোনার বাংলায় দেখো পাখিরা গান গায়, এ দেশটাকে স্বাধীন করতে বাঙ্গালী অকাতরে দিয়েছে ৩০ লক্ষ মানুষের বলিদান ।

৭.মুজিব নামে

কবির কাঞ্চন


মুজিব নামেই হৃদয় মাঝে ভেসে আসে সুর

সকল দেশের সেরা বলে লাগে সুমধুর।

অত্যাচারী হানাদারের করতে পরাজয়

মুজিব নামেই বুকের ভেতর রক্তধারা বয়।


মুজিব নামেই বিশ্ব মাঝে বীরের পরিচয়

রক্ত দিয়ে আদায় করে বাংলাদেশের জয়।

শোধ হবে না কোনোদিনও তাঁর ত্যাগেরই দাম

মুজিব নামেই মিশে আছে বাংলাদেশের নাম।


মুজিব নামেই দেশের মানুষ যোদ্ধা হয়ে যায়

স্বাধীন দেশে ঘুরেফিরে স্বস্তি ফিরে পায়।

সোনার বাংলা গড়তে হলে করতে হবে কাজ

মুজিব নামেই জাগতে হবে ভেঙে সকল লাজ।

৮.বঙ্গবন্ধু

একটি অমর কণ্ঠস্বর


যখন দিনের আলো ঢাকে বৈষম্যের কালোরাতে

তেরশ নদীর স্রোতে নোনাজল মিশে করে হাহাকার

যখন অত্যাচারের তীব্রদাহে ফাটে বাংলার মাটি

ঠিক তখনই একটি কণ্ঠস্বর হেঁটে বেড়ায় বাংলায়

শহরের কানাগলি, সবুজ ক্ষেত, মেঠোপথ চারিদিকে।


একজোড়া চোখের অতলে একটি স্বপ্নের সিঁড়ি

দীর্ঘ হতে থাকে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া।

তারপর ত্রিশ লক্ষ লাশের সোপান পেরিয়ে পেয়েছি

একটি মুক্ত আকাশ—অন্ধকার তাড়ানো একটি সূর্য

যার আলো শোকাহত শিশির ভেজা সবুজ দুর্বাদলে

হীরার মতই চকচকে, বিচ্ছুরিত আলোতে গড়ে রামধনু।

তারপর সেই শিল্পী রংতুলিতে আঁকতে থাকেন

একটি পতাকা, একটি মানচিত্র নিখুঁত রঙে।


পনেরো আগস্ট, একদল বুভুক্ষু শকুন রক্ত খায়

ক্যানভাসে টেনে দেয় এক কালো পর্দার নেকাব।

সময়ের পাখি ফেরে—পতাকা উড়ায় আকাশ পানে

জীবন্তের চেয়ে বেশি এক অশরীরী পতপত কণ্ঠস্বর

আজও কথা বলে মানচিত্রের একান্ত ভেতর থেকেই।

৯.তোমার জন্মে ধন্য মাতৃভূমি

সুমন বনিক


তোমার ডাকে অস্ত্র হাতে করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ

স্বাধীনতার পরশ পেয়ে তাই হলাম পরিশুদ্ধ।

পরাধীনতার শিকল ভেঙে উন্নীত করি বিজয়ের শির

সারাবিশ্ব বিস্ময়ের চোখে দেখে এ জাতি বীর।

তুমি বাঙালির ইতিহাসের পাতায় সেই অমর মহাকাব্য

তুমি নাই তাই আজি মধুমতি হারায় নাব্য।

বীর বাঙালির হৃদয় তুমি রাজনীতির মহাকবি

পতাকার অই লাল সূর্যটায় তুমি আছো উজ্জ্বল ছবি।

মুক্ত আকাশ সূর্যের মতো দীপ্তি ছড়াও সেই তুমি

তোমার জন্মে ধন্য আমরা ধন্য এই মাতৃভ‚মি।

১০.অনন্য একটি নাম 

নিতাই পদ বণিক


চোখের কালিতে মনের খাতায় 

লিখে দিলাম একটি নাম 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু 

শেখ মুজিবুর রহমান।


আকাশের নীলে সাগরের জলে

এঁকে দিলাম একটি নাম 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু 

শেখ মুজিবুর রহমান।


ফুল পাখিদের কলগানে

কাননে মধূপ গুঞ্জরণে

গেয়ে যায় একটি নাম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু 

শেখ মুজিবুর রহমান।


নদীর স্রোত ঝরনা ধারায় 

ছন্দ ছড়ায় অস্ফুট বেদনায় 

ধ্বনিত হয় একটি নাম 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু 

শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতা বিষয়ক কবিতা - Poems on Independence


১.একটি পতাকা পেলে

হেলাল হাফিজ


কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেস ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন,–’পেয়েছি, পেয়েছি’।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে, বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসন্মানে সাদা দুতে-ভাতে।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে, সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।

২.স্বাধীনতা, উলঙ্গ কিশোর

নির্মলেন্দু গুণ


জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত

বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও।

তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে,

প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে,

মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থাকো, তুমি দীর্ঘজীবী হও।

তোমার হা-করা মুখে প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে

সূর্যাস্ত অবধি হরতাল ছিল একদিন,

ছিল ধর্মঘট, ছিলো কারখানার ধুলো।

তুমি বেঁচেছিলে মানুষের কলকোলাহলে,

জননীর নাভিমূলে ক্ষতচিহ্ন রেখে

যে তুমি উল্ঙ্গ শিশু রাজপথে বেরিয়ে এসেছো,

সে-ই তুমি আর কতদিন ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’ বলে

ঘুরবে উলঙ্গ হয়ে পথে পথে সম্রাটের মতো?

জননীর নাভিমূল থেকে ক্ষতচিহ্ন মুছে দিয়ে

উদ্ধত হাতের মুঠোয় নেচে ওঠা, বেঁচে থাকা

হে আমার দূঃখ, স্বাধীনতা, তুমিও পোশাক পরো;

ক্ষান্ত করো উলঙ্গ ভ্রমণ, নয়তো আমারো শরীরি থেকে

ছিঁড়ে ফেলো স্বাধীনতা নামের পতাকা।

বলো উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয়,

বলো দূঃখ কোনো স্বাধীনতা নয়,

বলো ক্ষুধা কোন স্বাধীনতা নয়,

বলো ঘৃণা কোন স্বাধীনতা নয়।

জননীর নাভিমূল ছিন্ন-করা রক্তজ কিশোর তুমি

স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তুমি বেঁচে থাকো

আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রেমে, বল পেন্সিলের

যথেচ্ছ অক্ষরে,

শব্দে,

যৌবনে,

কবিতায়।

৩.একটি পূর্ণিমা রাত


শোষিত বাংলার বুকে যখন তৃষ্ণায় হাহাকার

অত্যাচারের ধোঁয়ায় যখন সন্ধ্যারা নেমে আসে

বৃক্ষরা ছায়া গোটায় নিশ্চুপ শোয় রাত্রির কোলে

বৈষম্যের পোড়া গন্ধে যখন বাতাসের ক্রন্দন

তখন রাত্রির বুকে জোনাকে জ্বলে আশার আলো

রাজপথে পড়ে থাকে জোনাকের বায়ান্নর দেহ।

তারপর জোনাকের আলোগুলো মার্চের রাতেই

আলো বিবর্ধন মন্ত্রে পরিণত হয় চাঁদের আলোয়

অন্ধকার খসে খসে জেগে ওঠে পূর্ণিমার আলো

তখন বাতাসে ভাসে গন্ধরাজ ফুলের সুঘ্রাণ

আর জোছনা আলোয় চুয়ে চুয়ে পড়ে স্বাধীনতা।

৪.কবিতার নাম: স্বাধীনতা তুমি

শামসুর রাহমান


স্বাধীনতা তুমি

রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।

স্বাধীনতা তুমি

কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো

মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-

স্বাধীনতা তুমি

শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা

স্বাধীনতা তুমি

পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।

স্বাধীনতা তুমি

ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।

স্বাধীনতা তুমি

রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।

স্বাধীনতা তুমি

মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।

স্বাধীনতা তুমি

অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।

স্বাধীনতা তুমি

বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর

শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।

স্বাধীনতা তুমি

চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।

স্বাধীনতা তুমি

কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।

স্বাধীনতা তুমি

শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক

স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।

স্বাধীনতা তুমি

উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।

স্বাধীনতা তুমি

বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।

স্বাধীনতা তুমি বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।

স্বাধীনতা তুমি

গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,

হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।

স্বাধীনতা তুমি

খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,

খুকীর অমন তুলতুলে গালে

রৌদ্রের খেলা।

স্বাধীনতা তুমি

বাগানের ঘর, কোকিলের গান,

বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,

যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।

৫.স্বাধীনতার সুঘ্রাণ


সেদিনের অন্ধকার রাত্রিগুলো এতো নির্জন ছিল না

ফুরফুরে বাতাসের শীতল শরীরও ছিল না

ছিল না জোছনামাখা রাতের শান্তির ঘুম

সেদিন—রাতগুলোর অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল বৈষম্য

অত্যাচারের বিবশ চিৎকারের আহত বাতাস

লুণ্ঠনের কাঁটাতারে ঝোলানো ছিল জোছনা আলো।

সাত কোটি অন্ধকার হৃদে যখন ভারী নিঃশ্বাস

যখন অত্যাচারের কালো ধোঁয়ায় আঁধার নামে

ঠিক তখনই একটি তর্জনী সূর্যের মতো আলো ছড়ায়

বাতাসে ছড়িয়ে দেয় স্বাধীনতার সুঘ্রাণ

সতেজতা ফিরে আসে—জেগে ওঠে কোটি কোটি প্রাণ।

সেদিনের তর্জনীর ধ্যুতি অসীম সাহস বাঙালি বুকের

মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসায় জ্বলে লেলিহান শিখা

উজ্জীবিত করে এক সাগর নোনতা রক্তে

রক্ত চোষক জোঁককে চুবিয়ে মারতে।

সেদিনের তর্জনীর কম্পাঙ্কে আন্দোলিত কোটি প্রাণ

দূরে কোথাও কোকিল—গেয়ে যায় বসন্তের গান।

৬.বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা

কবি শামসুর রাহমান


নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।

মমতা নামের প্রুত  প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়

ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে

শিউলিশৈশবে ‘পাখী সব করে রব’ ব’লে মদনমোহন

তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,

অবিচ্ছিন্ন পরস্পর মমতায় লীন,

ঘুরেছি কাননে তাঁ নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই

ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।


আজন্ম আমার সাথী তুমি,

আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ’ড়ে পলে পলে,

তাইতো ত্রিলোক আজ সুনন্দ জাহাজ হয়ে ভেড়ে

আমারই বন্দরে।


গলিত কাচের মতো জলে ফাত্না দেখে দেখে রঙিন মাছের

আশায় চিকন ছিপ ধরে গেছে বেলা। মনে পড়ে কাঁচি দিয়ে

নক্সা কাটা কাগজ এবং বোতলের ছিপি ফেলে

সেই কবে আমি হাসিখুশির খেয়া বেয়ে

পৌঁছে গেছি রত্নদীপে কম্পাস বিহনে।


তুমি আসো আমার ঘুমের বাগানেও

সে কোন্ বিশাল

গাছের কোটর থেকে লাফাতে লাফাতে নেমে আসো,

আসো কাঠবিড়ালির রূপে,

ফুল্ল মেঘমালা থেকে চকিতে ঝাঁপিয়ে পড়ো ঐরাবত সেজে,

সুদূর পাঠশালার একান্নটি সতত সবুজ

মুখের মতোই দুলে দুলে ওঠো তুমি

বার বার কিম্বা টুকটুকে লঙ্কা ঠোঁট টিয়ে হ’য়ে

কেমন দুলিয়ে দাও স্বপ্নময়তায় চৈতন্যের দাঁড়।


আমার এ অক্ষিগোলকের মধ্যে তুমি আঁখিতারা।

যুদ্ধের আগুণে,

মারীর তাণ্ডবে,

প্রবল বর্ষায়

কি অনাবৃষ্টিতে,

বারবনিতার

নূপুর নিক্কনে

বনিতার শান্ত

বাহুর বন্ধনে,

ঘৃণায় ধিক্কারে,

নৈরাজ্যের এলো-

ধাবাড়ি চিত্কারে,

সৃষ্টির ফাল্গুনে


হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মিলিত সর্বক্ষণজাগরণে।


তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার ?

উনিশ শো’ বাহন্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি

বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।

সে ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে

কতো নোংরা হাতের হিংশ্রতা ধেয়ে আসে।

এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি,

এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস !

তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,

বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।

৮.তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

 শামসুর রাহমান

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,

তোমাকে পাওয়ার জন্যে

আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?

আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?


তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,

সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,

সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,

শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো

দানবের মত চিৎকার করতে করতে

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,

ছাত্রাবাস বস্তি উজাড হলো। রিকয়েললেস রাইফেল

আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।

তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।

তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাডায় প্রভূর বাস্তুভিটার

ভগ্নস্তূপে দাঁডিয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,

অবুঝ শিশু হামাগুডি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।


তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে

আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?

আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুডো

উদাস দাওয়ায় ব’সে আছেন – তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের

দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নডছে চুল।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে

মোল্লাবাডির এক বিধবা দাঁডিয়ে আছে

নডবডে খুঁটি ধ’রে দগ্ধ ঘরের।


স্বাধীনতা, তোমার জন্যে

হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে

বসে আছে পথের ধারে।

তোমার জন্যে,

সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,

কেষ্ট দাস, জেলেপাডার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,

মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,

গাজী গাজী ব’লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝডে

রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস

এখন পোকার দখলে

আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুডে বেডানো

সেই তেজী তরুণ যার পদভারে

একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে –

সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।


পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত

ঘোষণার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে,

মতুন নিশান উডিয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক

এই বাংলায়

তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।

৯.স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

 নির্মলেন্দু গুণ


একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে

লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,

এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,

এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না৷


তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?

তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে

ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হদৃয় মাঠখানি?


জানি, সেদিনের সব স্মৃতি ,মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত

কালো হাত৷ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ

কবির বিরুদ্ধে কবি,

মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,

বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,

উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,

মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ … ৷


হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,

শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি

একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে

লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প৷

সেই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর৷


না পার্ক না ফুলের বাগান, — এসবের কিছুই ছিল না,

শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত

ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়৷

আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল

এই ধু ধু মাঠের সবুজে৷


কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে

এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,

লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,

পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক৷


হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,

নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে

আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে৷


একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্যে কী ব্যাকুল

প্রতীক্ষা মানুষের: “কখন আসবে কবি?’ “কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,

রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷


তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?


গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের৷

১০.স্বাধীনতা

তাপস ঠাকুর

আমাকে কবি বলো না,

আমি কবিতা লিখিনি,

কবিতা পড়িনি,

শুধু কবিতাকে ঝড়ে পরতে দেখেছি,

শুকনো পাতার মত পুড়ে মরে যেতে দেখেছি ।


ঐ কবিতাকে দেখেছি শ্বশানের পথে-ক্ষুধার্ত।

যেন দুরবিক্ষে তলিয়ে গেছে তার ভিটে-মাটি।

সেই কবিতাকে আমি,

বুকে আগলে রাখতে পারিনি,

অবজ্ঞা-অবহেলা আর অনাদরে সে এখন অন্ধ।


সেই কবিতা আমি বুঝিনি,জানিনি কোনদিন,

শুধু তার চোখে বার্তা পেয়েছি নতুন দিনের-নতুন আলোর ।

হ্যা, আমি সেই বার্তা বাহক ।

কালের খেয়ায় আবার এসেছি

এই অর্ধমৃত পৃথিবীতে ।


ঐ পায়ে ফেসা ফুল ,

ডাস্টবিনের পাশে পরে থাকা

অসহায় নবজাতকের চোখ,

যেন হয় ধুসর অন্ধকার পৃথিবীর -ছোট ছোটআলোকময় দ্বীপ ।

অথবা এই অসভ্য পৃথিবীর বাগিচা।

অথচ, তারা পরে আছে পথে-ধুলোয়,

তাদের ভবিষ্যৎকারো মুঠোয় বন্দী।

আমি কী লিখব তার প্রতি-উত্তর ?

ঐ বঞ্চিত চোখ, ঐ পায়ে ফেসা ফুলগুলি

কেবলই একটি কবিতা খুঁজে প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্তে,

যেন কবিতা এই অন্ধকার পৃথিবীতে মৃত,

যেন কোন এক বিশেষ শ্রেণীর আলোক উজ্জ্বলরঙমহলে,

অথবা বাজার অর্থনীতির লোভী চক্ষুতেবন্দী এই কবিতা ।


যদি আমার একক পৃথিবী

ভেসে যায় কোনদিন জনতার জোয়ারে ,

তবে শহরের আনাচে কানাচে

প্রতিটি রাস্তায় প্রতিটি প্রানে,

বিশাল অক্ষরে ।

তোমাদের প্রিয় কবিতাটি

আমি লিখে দিয়ে যাব !!

যার নাম- স্বাধীনতা ।